আজ ঐতিহাসিক বদর দিবস

ইসলাম

মুহাম্মদ মাহবুবুল হক

আজ ১৭ রমজান।ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধের দিন।ইতিহাসের বাঁক বদলের দিন।এ দিন পৃথিবীর মানচিত্রে বুকটান দিয়ে,মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিলো ইসলাম।ইসলামের নবজাগরণের সূচনা হয়েছিল সেদিন।বিশ্ববাসী দেখেছিলো নতুন এক পরাশক্তিকে।মুসলমানদের ঐতিহ্য ও গৌরবের অধ্যায় শুরু হয় বদর বিজয়ের মধ্য দিয়ে।

নতুন এক সমরনায়কের যুদ্ধ কৌশল ও পরিকল্পনার কাছে তৎকালীন আরবের সুপার পাওয়ার নাকে খত দিতে বাধ্য হয়। যুদ্ধাভিযানে অভিজ্ঞ আরবের আবু সুফিয়ান ও আবু জাহেলের মতো প্রভাবশালী নেতাদের দম্ভ ও অহংকার চূর্ণ হয় অস্ত্র-শস্ত্রহীন অনভিজ্ঞ মুজাহিদ বাহিনীর সামনে।

ইসলামের প্রথম সামরিক অভিযানের প্রথম বিজয়।এ লড়াই ছিলো সত্য ও মিথ্যার,হক ও বাতিলের।ইসলাম ও কুফরের লড়াইয়ে ইসলামের সত্যের শক্তির অলৌকিক বিজয় হয়েছিলো। কুরআনুল হাকিমে এ দিনকে ‘ইয়াউমুল ফুরকান’ তথা সত্য-মিথ্যা পার্থক্যের দিন বলে অভিহিত করা হয়েছে।

৬২৪ খৃষ্টাব্দ,দ্বিতীয় হিজরি ১৭ রমজান মদীনার উপকন্ঠে বদর প্রান্তরে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়।মক্কা থেকে ১২০ মাইল ও মদিনা থেকে ৮০ মাইল দূরে মধ্যবর্তী স্থানে বদর কূপের অবস্থান।

সে যুদ্ধে অমুসলিমদের সেনাসংখ্যা ছিল ১০০০। ছিল ১০০টি ঘোড়া, ৬০০ লৌহবর্ম এবং অসংখ্য উট। অমুসলিমদের সেনাপতি ছিলেন ওতবা বিন রবিআ। যুদ্ধে ৭০ জন অমুসলিম নিহত হন এবং বন্দীও হন ৭০ জন।

এদিকে মুসলিম বাহিনীতে সেনাসংখ্যা ছিলো ৩১৩ জন। মুহাজির ছিলেন ৮২ জন। আর বাকি সবাই আনসার। আওস গোত্রের ৬১ জন এবং খাজরাজ গোত্রের ১৭০ জন। মুসলিমদের উট ও ঘোড়ার সংখ্যা ছিল যথাক্রমে: ৭০টি ও ২ টি। যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর ১৪ জন মুজাহিদ শহীদ হন।

বদর যুদ্ধে মুসলিম মুজাহিদ সংখ্যা, যুদ্ধের উপকরণ ও সরঞ্জাম কাফেরদের তুলনায় ছিলো খুব কম।মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বশরীরে যুদ্ধের ময়দানে নেতৃত্ব দেন।ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষার প্রথম জিহাদে নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর সমীপে আবেগঘন মোনাজাত করলেন,’স্বল্প সংখ্যক মুজহাদিদের যদি আল্লাহ সাহায্য না করেন,এই পৃথিবীতে আল্লাহর ইবাদত করার কেউ থাকবে না।’ ইসলামের সূর্য অস্তমিত হয়ে যাওয়ার ভয়,যুদ্ধের জনশক্তি ও সমরাস্ত্রের সংকট থাকায় মুসলিম শিবিরে এক অজানা শঙ্কা ছিলো।
বদর যুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে আকাশ পানে উভয় হাত তুলে সেদিন ডুকরে ডুকরে কেঁদে ওঠেন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।আল্লাহতাআলা সেদিন নবীজীর দোয়া কবুল করেছিলেন।

মহাগ্রন্থ কুরআনুল কারিমে সুস্পষ্ট বর্ণনা এসেছে বদর যুদ্ধ ও মুসলমানদের বিশ্বজয়ের।
আল্লাহ বলেন, “এবং বদরের যুদ্ধে যখন তোমরা হীনবল ছিলে আল্লাহ্ তো তোমাদেরকে সাহায্য করেছিলেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।
স্মরণ করুন, যখন আপনি মুমিনগণকে বলেছিলেন: এটা কি তোমাদের জন্য যথেষ্ট নয় যে, তোমাদের প্রতিপালক প্রেরিত তিন সহস্র ফিরিশতা দ্বারা তোমাদেরকে সহায়তা করবেন?
হ্যাঁ, নিশ্চয়, যদি তোমরা ধৈর্যধারণ কর এবং সাবধান হয়ে চলো তবে তারা দ্রুতগতিতে তোমাদের ওপর আক্রমণ করলে আল্লাহ পাঁচ সহস্র চিহ্নিত ফিরিশতা দ্বারা তোমাদের সাহায্য করবেন।এটা তো কেবল তোমাদের জন্য সুসংবাদ ও তোমাদের চিত্ত-প্রশান্তি-হেতু আল্লাহ করেছেন। এবং সাহায্য শুধু পরাক্রামশালী প্রজ্ঞাময় আল্লাহর নিকট থেকেই হয়।”-(সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১২৩)

বদর বিজয়ের পর মুসলমানদের জয়যাত্রা ছড়িয়ে পর বিশ্বময়।জিহাদের অনুমতি লাভের পর প্রথম বিজয়ের মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী ইসলাম প্রচারের পথসুগম হয়।অনেক অঞ্চল, দেশ জিহাদ ছাড়াই ইসলামের জন্য উন্মুক্ত হয়।বিশজোড়ে ইসলামের জয়জয়কারের নবসূচনা হয়।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুদক্ষ নেতৃত্ব, আল্লাহর সাহায্য, সাহাবায়ে কেরামের রা. দৃঢ় মনোবল ও ঈমানী শক্তির স্রোতে সহস্রাধিক যোদ্ধা ও যুদ্ধ সরঞ্জাম থাকার পরও খড়কুটোর মতো ভেসে গিয়েছিল কাফের বাহিনী।বদর যুদ্ধের অল্পবয়স্ক মুজাহিদ মুআজ ও মুআওয়িজের বীরত্বের গল্প আন্দোলিত করে মুসলিম যুবকদের।ইসলামের শত্রু কাফেরদের শীর্ষ নেতা আবু জাহেলকে হত্যার নেশায় সেদিন মেতে ওঠেছিলেন আফরার এই দুই ছেলে।আবু জাহেলকে সে দিন তারা হত্যা করেছিলেন।

বদর যুদ্ধের অনুপ্রেরণা ও শিক্ষা নিয়ে আমাদের মাঝে বারবার আসে ১৭ রমজান।এই মুসলিম ঐতিহ্য, কীর্তি ও বদরের শিক্ষাকে লালন করে না বর্তমানের মুসলমানরা।বদরের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ ও ঈমানদীপ্ত মনোবল থাকলে আজ বিশ্বে মুসলমানদের এই অসহায় চিত্র দেখতে হতো না।সিরিয়া,ইরাক,ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান ও আরাকানসহ বিশ্বের নানা দেশে মুসলিম মা-বোনদের আর্তচিৎকারে আকাশ ভারী হতো না।বদরের চেতনায় উজ্জীবিত ঈমান নেই বলে কোটি কোটি মুসলমানের এই পৃথিবীতে মুসলমনারই সবচে বড় অসহায়। আজ বিশ্বে ১৯০ কোটি মুসলমান অথচ ৩১৩ জন বদরের বীর সাহাবাদের মতো ঈমান নেই কারও।

বদরের যুদ্ধ মুসলিম জাতীর জন্য এক নিদর্শন ও অনুপ্রেরণা লাভের অন্যতম শিক্ষা। এ যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় এটা প্রমাণ করে যে সত্যনিষ্ঠ কাজে বিজয়ের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করার পাশাপাশি কঠোর পরিশ্রম, দৃঢ়তা, ধৈর্য ও সহনশীলতার বিকল্প নেই।সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের অনন্য উপমা বদর।মুসলমানদের হারানো শাসনব্যবস্থা ইসলামি খিলাফাহ পুনরুদ্ধারে ও ইসলামের চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য বদরের চেতনার বিকল্প নেই।আবারও পৃথিবীতে ইসলামি খিলাফাহ প্রতিষ্ঠা করতে হলে বদরের চেতনায় উজ্জীবিত হতে হবে।

লেখক: সম্পাদক,ভয়েসটাইমসটুয়েন্টিফোর ডটকম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *