ঈদুল আযহা: ত্যাগের অনুপম উৎসব

ইসলাম

মুহাম্মদ আবদুল হামিদ: বছর ঘুরে আবার মুসলমানদের মাঝে এসে হাজির হল আত্মত্যাগের মহান উৎসব ঈদুল আযহা। প্রতি বছর ত্যাগের মহিমায় আনন্দের বার্তা নিয়ে হাজির হয় পবিত্র ঈদুল আযহা। ইদুল আযহায় পশু কুরবানি ত্যাগের শক্তিতে নববলে বলিয়ান হওয়ার এক মাহেন্দ্রক্ষণ। কবি কাজী নজরুলের ভাষায় ‘ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন’

এবার কুরবানি এসেছে এমন এক সময় যখন দেশে দেশে মুসলমানরা নির্যাতিত-নিপিড়িত, যুদ্ধ-বিগ্রহ, অশান্তি-অরাজকতা বিদ্যমান। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে আত্মত্যাগের শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে আজ মুসলমানদের মাঝে অনৈক্য ও বিভাজন দেখা দিয়েছে।

আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও তার হুকুম পালনের জন্য নবী ইবরাহীমকে (আ.) সবচেয়ে প্রিয় বস্তু ত্যাগ বা কুরবানি করতে হয়েছিল। আর এই ত্যাগের মহিমায় তিনি ও তার প্রিয় পুত্র ইসমাঈল পৃথিবীর ইতিহাসে চিরভাস্মর হয়ে আছেন এবং কিয়ামত অবধি থাকবেন। আল্লাহর খলীল হযরত ইবরাহীম (আ.) এর কুরবানি মানব ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। বয়োঃবৃদ্ধ ইবরাহীম (আ.) প্রভুর দরবারে আপাদমস্তক অবনত হয়ে কাকুতি-মিনতি করে ফরিয়াদ করেছিলেন- “রাব্বী হাবলী মিনাস সালিহীন”- ‘হে প্রভু! নেক সন্তান দিয়ে আমায় ধন্য করুন’। অবশেষে একদিন তাঁর ফরিয়াদ আল্লাহ শুনেই নিলেন।

আল্লাহ বলেন- ‘অতঃপর আমি তাকে একজন ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম।’

৮৬ বছর বয়সে ইবরাহিমকে আল্লাহ পাক দান করলেন ছেলে ইসমাঈল। আল্লাহ তা’লা তাঁর খলীলকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষায় ফেলেছিলেন। ইবরাহীম (আ.) আল্লাহর প্রিয়তম বন্ধু। তিনি আল্লাহর আনুগত্য ও বশ্যতায় হুকুমের তামিল করতে কোন রকম অজুহাত খুজতেন না। আনন্দচিত্তে মেনে নিতেন। তাঁর কলিজার টুকরা সন্তানকে মায়ের সাথে মক্কা মুকাররামায় রেখে আসার হুকুম দিলেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। আল্লাহর বন্ধু ইবরাহীম (আ.) হাসিমুখে মেনে নিলেন এবং দেরি না করে সাথে সাথে তা পালন করলেন। প্রিয় সন্তানকে নিয়ে চলে এলেন মক্কার মরুপ্রান্তরে। আল্লাহর প্রতি অগাধ আস্থা ও বিশ্বাসের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে জনমানবহীন অনাবাদি মক্কায় স্ত্রী পুত্রকে রেখে গেলেন ।

জীবনের কঠিনতম সময় অতিক্রম করতে করতে যখন যৌবনের চৌকাঠে পা রাখলেন চোখেরমণি কলিজার টুকরা ইসমাঈল। ইবরাহীম (আ.) যখন সন্তানকে নিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন সাজাচ্ছিলেন ঠিক এই সময়ে তাঁর নিকট স্বপ্নযোগে আল্লাহর হুকুম পৌছল-

‘এবার তোমার প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানের জানের কুরবানিই আমার সিদ্ধান্ত।’

আহ! এ কেমন হৃদয়বিদারক হুকুম? দীর্ঘ প্রত্যাশার পর প্রাপ্ত প্রাণপ্রিয় ছেলেকে নিজ হাতে যবাই করে দেবে বৃদ্ধ বাবা তা কি বস্তুবাদের দুনিয়ায় কেউ কল্পনাও করতে পারে? কিন্তু মানবতার ইতিহাসে এর উজ্জল দৃষ্টান্ত আজও ইতিহাসের পাতায় সোনালী অক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত লিপিবদ্ধ থাকবে। দুনিয়াবাসী যে হুকুমটি পালনের কথা কল্পনাও করতে পারে না, খলীলুল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আ.) সেই হুকুমটি আনন্দচিত্তে মেনে নিয়ে তা পালন করলেন এবং নির্ধারণ করে নিলেন নিজের জন্য সম্মান ও মর্যাদার আসন। এই হৃদয়বিদারক হুকুম পালনে সৌভাগ্যমন্ডিত পুত্র তাঁর পিতার সঙ্গে কাধে কাধ মিলালেন এবং ‘যবীহুল্লাহ’ উপাধি লাভে ধন্য হলেন। যখন তারা পিতা-পুত্র দু’জনই আল্লাহ তা’লার ইচ্ছার সামনে আত্মসমর্পন করলেন, পুত্র গলা পেতে দিলেন, জবাই করার জন্য পিতা ছুরি নিয়ে তৈরী হয়ে গেলেন, তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয় খলীলকে আওয়াজ দিলেন-

“হে ইবরাহীম! আপনি তো অবশ্যই স্বপ্নটি সত্যে পরিণত করেছেন, আমি তার পরিবর্তে দিলাম জবাই করার জন্য একটি মহান জন্তু।”

আল্লাহ তা’লা তাঁর অপার কুদরতের মহিমায় পশু কুরবানির মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখলেন যবীহুল্লাহ ইসমাঈল (আ.) কে। পিতা-পুত্রের এই ত্যাগ আল্লাহর কাছে এতই পছন্দ হলো যে, কিয়ামত পর্যন্ত তাঁদের সুনাম, সুখ্যাতি সমুজ্জল করে দিলেন এবং তাঁর পবিত্র কিতাব কুরআনে অনুপমভাবে বর্ণনা করলেন।

“সে (ইসমাইল) যখন তার পিতার সাথে কাজ করার বয়সে উপনীত হলো, তখন ইবরাহীম (আ.) ছেলেকে বললেন, হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমি যেন তোমাকে যবাই করছি, বলো এ ব্যাপারে তোমার অভিমত কি? সে বললো, হে আমার বাবাজান! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তা পালন করুন, ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের সাথে পাবেন। অতঃপর যখন তারা পিতা-পুত্র দু’জনই আল্লাহ তা’লার ইচ্ছার সামনে আত্মসমর্পন করলেন এবং তাকে যবাই করার জন্য শোয়ালেন, তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, হে ইবরাহীম! আপনি তো অবশ্যই স্বপ্নটি সত্য পরিণত করেছেন, আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের পুরস্কার দিয়ে থাকি। এটা ছিল একটা সুস্পষ্ট পরীক্ষা মাত্র। আমি তার পরিবর্তে দিলাম জবাই করার জন্য একটি মহান জন্তু। পরবর্তী মানুষদের মাঝে এভাবেই আমি তার স্মরণকে অব্যাহত রেখে দিলাম।” (সুরা সাফফাত- ১০০-১০৯)

মুসলিম জাতির পিতা আল্লাহর খলীল ইবরাহীম (আ.) কর্তৃক তাঁর পুত্র ইসমাঈল কুরবানির ঐতিহাসিক এ ঘটনাটি মানবজাতির জন্য আল্লাহর নির্দেশ পালন ও তাঁকে সন্তুষ্ট করার জন্য ত্যাগের এক অনুপম নিদর্শন। খলীলুল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আ.) ও তাঁর পুত্র যবীহুল্লাহ হযরত ইসমাঈল (আ.) ত্যাগের মহিমায় মর্যাদার সর্বোচ্ছ শিখরে চির অম্লান। মানবতার ইতিহাসে তাঁদের সুনাম, সুখ্যাতি কিয়ামত অবধি থাকবে সমুজ্জল। মুলত, তাদের এই ত্যাগের দৃষ্টান্তকে সমুজ্জল করে রাখার জন্য রাব্বুল আলামীন দুনিয়ার সামর্থবান মুসলমানদের জন্য বছরের নির্ধারিত দিনে নির্দিষ্ট জন্তু কুরবানি করাকে বিধিবদ্ধ করে দিলেন।

এরই দ্বারাবাহিকতায় প্রতি বছর আমাদের মাঝে আসে কুরবানির ঈদ বা ত্যাগের উৎসব। অসংখ্য অগণিত পশু জবাই করা হয় আল্লাহর নামে। আমরা কুরবানির সেই আত্মত্যাগের শিক্ষা আর খোদাপ্রেমের অনুপম দৃষ্টান্ত অন্তরে ধারণ করে পশু যবাইয়ের সময় মনের কলুষতা, লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, ক্রোধ, স্বার্থপরতা, আন্তরের পশু চরিত্রকে হত্যার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির প্রয়াস চালাবো।

সমগ্র মুসলিম উম্মাহ ঈদুল আযহার ত্যাগের শিক্ষা, চেতনা ও আদর্শ লালন করে বিভেদ ভুলে ঐক্য ও সংহতি স্থাপন করে মিল্লাতের সোনালী যুগের আদর্শে নব চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে উঠুক।

শিক্ষক : জাময়া ইসলামিয়া আনওয়ারে মদিনা মাদরাসা, ইসলামপুর, সিলেট

জেআর/