ঈদের জরুরী মাসাঈল

ইসলাম

মুফতি সৈয়দ নাছির উদ্দিন আহমদ

প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কোনো না কোনো দিন অবশ্যই এমন আছে, যার মধ্যে তারা স্বাভাবিক ভাবে আনন্দ খুশি করে থাকে।উত্তম পোশাক পরিধান করে,ভালো উন্নত মানের খাবার রান্না করে খায়। তাই হাদিসের মধ্যে বর্ণিত আছে,لكل قوم عيد وهذا عيدنا প্রত্যেক জাতির জন্য ঈদ রয়েছে, এটা হলো আমাদের ঈদ।এটা এমন দিন যখন লোকেরা সবেমাত্র রোযা থেকে ফারিগ হয়েছে এবং এক ধরনের যাকাত আদায় করেছে। ইসলাম ধর্ম উৎসবের দু’টি দিন নির্ধারিত করেছে।ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা।

ঈদের সংজ্ঞা:ঈদের শাব্দিক অর্থ প্রত্যাবর্তন করা।আনন্দ উৎসবের দিনকে ঈদ বলা হয় । কিন্তু শরীয়তের পরিভাষায় মুসলমানগণ বছরে যে দু’টি দিবসকে আনন্দ উৎসবের দিন হিশেবে পালন করে থাকে তাকে ঈদ বলা হয়।

ঈদের নামাযের হুকুম: ঈদের নামায পড়া ওয়াজিব। তাই যথাসম্ভব চেষ্টা করতে হবে,যেন ঈদের নামায পড়া যায়।( বাদায়েউস সানায়ে ২/২৩৬)

ঈদের নামাযের শর্ত: ঈদের নামাযের জন্য শর্ত তা’ই, যা জুমআর নামাযের জন্য শর্ত। পার্থক্য শুধু জুমআর নামাযের আগে খুতবা পড়া ফরজ,আর ঈদের নামাযের পর খুতবা পড়া সুন্নত। (বাদায়েউস সানায়ে২/২৩৭)

যাদের উপর ঈদের নামায ওয়াজিব : যে ব্যক্তির উপর জুমআর নামায ওয়াজিব তার উপর ঈদের নামাজও ওয়াজিব।ঈদের নামাযের পর খুতবা দেয়া সুন্নত। ঈদের নামাযের পূর্বে খুতবা পড়ে নিলে মাকরূহের সাথে নামায আদায় হবে।(বাবাদায়েউস সানায়ে২/২৩৭,২৪০,২৪১
আলমগীরী ৩/৬৩,কিতাবুল ফিকহ ১/৫৪৮)

ঈদের সূচনা কাল:

মুসলিম জাতির জনক হযরত ইবরাহীম (আ:)
আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য নিজের একমাত্র পুত্র হযরত ঈসমাঈল (আ:) এর গলায় ছুরি চালিয়ে তাঁর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রমাণ করেছিলেন ।
আর মহান আল্লাহ পাক ইশক, মুহব্বতের ও কুরবানীর পরীক্ষায় ইবরাহীম (আ:) কে উত্তীর্ণ করে ঈসমাঈল(আ:) কে প্রাণে বাঁচিয়ে দিলেন।
তাঁর স্থানে কুরবানী করিয়ে দিলেন একটি প্রাণী; সাথে সাথে হযরত ইবরাহীম(আ:)এর মাথায় পরিয়ে দিলেন (ইন্নি-জায়িলুকা লিন-ন্নাস্ ইমা’মা) এর তাজ বা মুকুট । আর ইবরাহীমের এ অভূতপূর্ব আনুগত্যের নিদর্শনকে কিয়ামত পর্যন্ত আগত উম্মতের মধ্যে স্মরণীয় করে রাখতে প্রবর্তন করলেন ঈদুল আজহা বা কুরবানীর ঈদ ।

তাই রাসূলুল্লাহ (সা:) যখন হিজরত করে মদিনায় তাশরীফ নিলেন,তখন থেকে মুসলিম জাতীর সামাজিক জীবন শুরু হয়। ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা এ দুই ঈদ হিজরতের পর থেকে উদযাপন শুরু হয় । এব্যাপারে দু’টি অভিমত পাওয়া যায়। কেউ কেউ বলেন, প্রথম হিজরী সনে ঈদের নামাজের বিধান প্রবর্তিত হয়। তবে অধিকাংশ আলেমদের মতে দ্বিতীয় হিজরী সনে তার বিধান প্রবর্তিত হয় । ( আবু দাউদ-মিশকাত শরীফ হাদীস ১/১৩৫৫)

♢ তাকবীরে তাশরীকের হুকুম :

যিলহজ্ব মাসের ৯ তারিখ ফজর নামাজের পর থেকে ১৩ তারিখ আছর নামাজ পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামায আদায় করার পর পুরুষের জন্য উচ্চ আওয়াজে আর নারীদের জন্য নিম্ন আওয়াজে একবার তাকবীর বলা ওয়াজিব। এ হুকুম নারী, পুরুষ, মুকিম, মুসাফির,শহর ও গ্রামে জামাতে কিংবা একাকী নামায আদায়কারী সকলের উপর প্রযোজ্য । এরি উপর ফতোয়া । (ফতোয়ায়ে শামী ১/৭৮৪, দারুল উলুম ৫/২১৯)

♢ তাকবীর হল এই যে,

الله أكبر الله أكبر لا إله إلا الله الله اكبر الله اكبر وللله الحمد
♢ ঈদুল আজহার নামাযের পর তাকবীর বলাতে কোন সমস্যা নেই । (দুররে মুখতার ১/৮০০)

♢ কাযা নামাযের পর তাকবীরে তাশরীক পড়া?
কাযা নামাযের পর তাকবীরে তাশরীক পড়ার জন্য তিনটি শর্ত রয়েছে ।

(১) আদায়কৃত নামাযটি আইয়ামে তাশরীকের সময়কার হওয়া ।
(২) আইয়ামে তাশরীকের মধ্যেই তা আদায় করা ।
(৩) চলতি বছরের নামায হওয়া । পূর্ববর্তী বছরের কাযা নামায না হওয়া ।

ঈদের নামাযের তারিখ: ঈদুল আজহা বা কুরবানির ঈদ উদযাপিত হয় যিলহজ্ব মাসের দশ তারিখে। সে হিশেবে বাংলাদেশ সহ আমাদের নিকটবর্তী দেশগুলোতে ঈদুল আজহা আগামী পহেলা আগষ্ট শনিবার অনুষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহ।

ঈদের নামাযের সময়: সূর্য এক বা দুই বর্শা পরিমাণ উচ্চতায় উঠা থেকে শুরু করে যাওয়াল তথা সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়া পর্যন্ত ঈদের নামাযের ওয়াক্ত বাকি থাকে ।( বাদায়েউস সানায়ে ২/২৪২, মাআরিফুল হাদিস ৩/৪০৩,দুররে মুখতার ১/৭৯১)

ঈদের নামাযের স্থান :
ঈদের নামায স্বাভাবিক অবস্থায় খোলা মাঠে পড়ারই বিধান। ঈদের জামাত মাঠে আদায় করা সুন্নত। ওজর ছাড়া মাঠ বর্জন করা সুন্নাতের খেলাফ। তবে কোন ওজরের কারণে মসজিদে আদায় করাতে কোন সমস্যা নেই।
(সহীহ বুখারী হাদীস : ৯৪৬-৯৫৬,মিশকাত শরীফ হাদিস : ১/১৩৪২,উমদাতুল কারী কিতাবুল ঈদাইন ৬/২৮১ ,৫/১৭১,মাযাহেরে হক ২/২৯৪)

ঈদের নামাযের আযান ইকামত :
হযরত জাবের ইবনে সামুরা (রা:) থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন,আমি একবার দুইবার নয়,বহুবার রাসূলুল্লাহ(সা:) এর সাথে আযান ইকামত ছাড়া নামায আদায় করেছি । (মাআরিফুল হাদিস :৩/৪০০ সহীহ মুসলিম)
উল্লেখিত হাদিস এবং ফিকহের আলোকে প্রতীয়মাণ হয় যে,ঈদের নামাযে আযান ইকামত নেই। এটিই সুন্নত তরিকা ।( ফাতাওয়া দারুল উলুম ৫/২৩৭)

ঈদের খুতবা :
ঈদের খুতবা সুন্নত,শ্রবণ করা ও চুপ থাকা ওয়াজিব।নামাযের পূর্বে বা খুতবার পরে চাদা উঠানো হলে সমস্যা নেই। তবে খুতবা চলাকালীন সময়ে তা বৈধ নয়।(বাহরুর রায়িক ২/২৮৩,ফাতাওয়া রহীমীয়্যাহ ৫/৮৮ কিতাবুল ফাতাওয়া ৩/৮৫)

খুতবার পর দুআ নেই : ঈদের নামাযের পরে অন্যান্য নামাযের মতো দুআ করা মাসনুন ও মুস্তাহাব। কিন্তু খুতবার পরে দুআ করার বিষয়টি প্রমাণিত নয় । এবং জায়েয ও নয়।( দারুল উলুম৫/২৩১,২১৯,১২৫,২১৩, ফাতাওয়া উসমানী ১/৫৪৭)

ঈদের নামাযের কাজা: দুই ঈদের নামায ওয়াজিব। কারো থেকে যদি তা ছুটে যায়,তাহলে সম্ভব হলে অন্য কোন ঈদগাহ মাঠে বা মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে শরীক হবে। যদি তাতে সম্ভব না হয় তাহলে কিন্তু পরে এর কাজা করতে পারবেনা । কারণ ঈদের নামাযের কাজা নেই। (হিন্দিয়া ১/১৫২,কিতাবুল ফাতাওয়া৩/
৮৬ )

ঈদের জামাত না পেলে করণীয়:
ঈদের জামাত জুমআর মতো শর্ত। তা ছুটে গেলে অন্য কোন স্থানে যাওয়া যদি সম্ভব হয় সেখানে গিয়ে শরীক হবে । অন্যথায় ওজরের কারণে অন্য জামাতে শরীক না হতে পারলে, চার রাকাত চাশতের নামায আদায় করে নিবে । তবে তা ঈদের নামায বলে বিবেচিত হবে না । (কিতাবুল ফাতাওয়া ৩/৮২, হিন্দিয়া ১/১৫২, দুররে মুখতার ১/৭৯৫)

ঈদের নামাযে অতিরিক্ত তাকবীর :
ঈদের নামাযে অতিরিক্ত তাকবীরগুলো হলো ওয়াজিব। তাকবীরে তাহরীমা এবং রুকুর তাকবীর ব্যতীত প্রতি রাকাতে তিনটি করে তাকবীর বলা ওয়াজিব। এগুলো বলার সময় উভয় হাত কান পর্যন্ত উঠানো সুন্নত । (আযীযুল ফাতাওয়া ১/৩০১,৩০৯)

♢ ঈদের নামাযের অতিরিক্ত তাকবীর কখন পড়বে ? ঈদের নামাযের অতিরিক্ত ছয়টি তাকবীর । এগুলোর পড়ার নিয়ম হল ; প্রথম রাকাতের তাকবীরে তাহরীমা বলার পর সানা পড়ে সুরা ফাতিহা ও কেরাতের পূর্বে তিনটি তাকবীর আর দ্বিতীয় রাকাতের কেরাতের পর রুকুতে যাওয়ার পূর্বে তিনটি তাকবীর বলা । প্রত্যেক তাকবীরের সময় হাত ছেড়ে রাখা ।( দুররে মুখতার ১/-৭৯১)

ঈদের অতিরিক্ত তাকবীর ছুটে গেলে করণীয়:
যদি ঈদের অতিরিক্ত তাকবীরের কোন একটি ছুটে যায় তাহলে ওয়াজিব ছুটে যাওয়ার কারণে সিজদায়ে সাহু ওয়াজিব হয়। কিন্তু যেহেতু ঈদের এবং জুমআর নামাযে সিজদায়ে সাহু লাযিম হয়না,তাই উক্ত ওয়াজিব ছুটে গেলেও ঈদের নামায সহীহ হয়ে যাবে ।( ফাতাওয়া উসমানী১/৫৫২)

ঈদের নামাযে মাসবুক হলে :
যদি কেউ প্রথম রাক’আতে অতিরিক্ত তাকবীরের পর ইমামের ইকতেদা করে তাহলে সে প্রথমে তাকবীরে তাহরীমা বলে অতিরিক্ত তাকবীর তিনটি বলবে।

যদি কেউ ইমামকে প্রথম রাক’আতের রুকু অবস্থায় পায়,তাহলে সে ব্যক্তি তাকবীরে তাহরীমা বলার পর  অতিরিক্ত তাকবীর বলে রুকুতে যাবে।

আর যদি আশংকা হয় যে,অতিরিক্ত তাকবীর বলতে গেলে ইমামকে রুকুতে পাবেনা,তাহলে সে প্রথমে রুকুতে যাবে । রুকুতে থাকা অবস্থায় রুকুর তাসবীহ পাঠ না করে অতিরিক্ত তাকবীর হাত উঠানো ব্যতীত আদায় করে নিবে।

আর যদি তাকবীরগুলো শেষ করার পূর্বেই ইমাম রুকু থেকে উঠে যায়,তাহলে অবশিষ্ট তাকবীর তার জন্য মাফ হয়ে যাবে।

যদি ঈদের নামাযের দ্বিতীয় রাক’আতে গিয়ে শরীক হয়,তাহলে প্রথমে সে কেরাত পড়বে।এরপর অতিরিক্ত তাকবীরগুলো বলে রুকুতে যাবে।

আর যদি দ্বিতীয় রাক’আতের রুকুতে গিয়ে শরীক হয়,তাহলে প্রথম রাক’আতের রুকুতে মাসবুক হলে যেভাবে নামায আদায় করে সে ভাবেই আদায় করবে। অর্থাৎ রুকুতে যাওয়ার পূর্বে তাকবীরগুলো বলবে তারপর রুকুতে যাবে।

আর যদি কেউ ইমামের সাথে দ্বিতীয় রাক’আতের রুকু শেষ হওয়ার পর সালামের আগ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে শরীক হয়,তাহলে ইমামের সালাম ফিরানোর পর দাড়িয়ে যাবে এবং ইমামের সাথে যেভাবে নামায আদায় হয়, ঠিক সেভাবেই পূর্ণ নামায আদায় করবে।
( আহসানুল ফাতাওয়া ৪/১৪৩, দুররে মুখতার ১/৫৮৪,৬১৬)

ঈদের দিনে নফল নামায :
হযরত ইবনে আব্বাস ( রা:) থেকে বর্ণিত । রাসূলুল্লাহ (সা:) ঈদুল ফিতরের দুই রাকাত নামায ব্যতীত তার আগে বা পরে অন্য কোন নফল নামায নেই ।
(বুখারী – মুসলিম ,মাআরিফুল হাদিস : ৩/৪১)

তাই ঈদগাহে হোক বা অন্য কোন স্থানে হোক হানাফি মাযহাব মতে ঈদের নামাযের পূর্বে নফল নামায পড়া মাকরূহ। ঈদের নামাযের পর ঈদগাহে পড়া মাকরূহ তবে ঘরে পড়া মাকরূহ নয়।( দারুল উলুম ৫/২২৭)

মহিলাদের জন্য ঈদগাহে অংশগ্রহণ:
বর্তমান সময়ে ফিতনার আশঙ্কা প্রবল হওয়ার কারণে ফুকাহায়ে কেরাম নারীদের ঈদগাহে ও মসজিদে গিয়ে নামায পড়তে নিষেধ করেন।
তাই তাদের জন্য ঈদগাহে বা মসজিদে গিয়ে জামাতে নামায পড়া মাকরূহ। তবে নামায পড়লে তা আদায় হয়ে যাবে।তাছাড়া নারীদের আসল স্থান হল তাদের বসবাসের ঘর। নারীদের মসজিদে এসে নামায পড়া রাসূল (সাঃ) পছন্দ করতেন না।তবে যেহেতু রাসূল(সাঃ)সবার নবী। আর রাসূল (সাঃ) এর কাছে ওহী নাজিল হতো। তাই নারীরা রাসূল (সাঃ) এর জমানায় ওহীর বানী শুনার জন্য মসজিদে আসতো। এটি ছিল শুধুই প্রয়োজনের তাগিদে। যে প্রয়োজন রাসূল (সাঃ) ইন্তেকালের দ্বারা বন্ধ হয়ে গেছে। (সহীহ ইবনে খুজাইমা, হাদীস নং-১৬৮৯,ইলাউস সুনান-৩/২৬,কিতাবুল ফাতাওয়া ৩/৮৮)

ঈদের জামাতে নামায শুরু হয়ে গেছে এমতাবস্থায় যদি প্রবল ধারণা হয় যে,ওযু করতে গেলে নামায ছুটে যাবে তাহলে সে তায়াম্মুম করে নামাযে শরীক হতে পারবে । ( মাসাইলে ঈদ : ৯২)

ঈদের নামাযের আগে বা পরে খাদ্যগ্রহণ :
হযরত বুরাইদা ( রা:) বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ(সা:) ঈদুল ফিতরের দিন কিছু না খেয়ে বাড়ি থেকে বের হতেন না। আর ঈদুল আজহার নামায আদায় করা পর্যন্ত কিছু খেতেন না।( তিরমিযী- মিশকাত শরীফ ১/১৩৫৬ )তাই ঈদুল আজহার দিন ঈদাগাহে গমনের পূর্বে কোন কিছু না খেয়ে যাওয়া মুস্তাহাব। ( মাসাইলে ঈদ : ৭৮)

আল্লাহ পাক যেন আমাদের সবাইকে ঈদুল আজহার তথা কুরবানীর হুকুম আহকাম সঠিকভাবে পালন করার তাওফিক দান করেন।আমীন।

লেখক:শিক্ষক,কলামিস্ট।