এলো অন্যরকম রমজান

ইসলাম জীবনযাপন সম্পাদকীয়

।।মুহাম্মদ মাহবুবুল হক।।

প্রতিবছরের ন্যায় এবারও রমজান এলো।তবে রমজানকে ঘিরে উচ্ছাসে পড়েছে ভাটা।মুসলিম সমাজে রমজান কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক আবহে বিরূপ প্রভাব পড়েছে।ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান হয়েছে সীমিত।রমজানের দিনরাত থাকে প্রাণোচ্ছল,আনন্দমুখর।কিন্তু এবারের রমজানকে প্রাণহীন মনে হচ্ছে।রমজানের সেই ভাবগাম্ভীর্যটা নেই।এরকম রমজান মুসলিম উম্মাহ দেখে নি কখনো।বিচিত্র এক অভিজ্ঞতা ও উপলব্দিতে কাটবে এ রমজান।এ যেন প্রেমময় রমজানে বিরহের ছায়া।

করোনাকালের এই দু:সময়ে মসজিদে হারাম,
মসজিদে নববি, মসজিদে আকসা কাঁদছে।পৃথিবীর সকল মসজিদের অব্যক্ত রোদনের সাথে কাঁদছে মুসল্লিও।১৪০০ বছরের ইতিহাসে এমন পরিস্থিতির শিকার হয় নি প্রাণের কাবা। সকল মসজিদ আজ মুসল্লিশূণ্য।মসজিদ থেকে শুনা যায় না কুরআনের সুমধুর সুর।মসজিদের ইমাম মুসল্লিদের শুনাতে পারেন না আলোকিত জ্ঞানের কথা,কল্যাণের বার্তা।মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ,জমুআর নামাজ কার্যত বন্ধ।শুক্রবারে মসজিদে মুসল্লিদের অাবেগঘন ইবাদতের পরিবেশ নেই।পাঁচ ওয়াক্তের নামাজেও মুখে মেসওয়াক,হাতে তাসবিহ নিয়ে মুসল্লিদের নেই আনাগোনা।মসজিদের প্রাণহীন এসব দৃশ্য দেখে কেঁদে ওঠে মুমিন হৃদয়।পরিস্থিতির কাছে হার মানছি আমরা।

রমজানুল মুবারক।ইবাদতের মৌসুম।মুসলমানরা আল্লাহ প্রেমে মশগুল থেকে ইবাদতে আত্মনিয়োগ করেন। ইবাদতের সাথে মসজিদের গভীর যোগসূত্র আছে। কিন্তু আল্লাহর ঘরের দরজা বন্ধ।তাই মুসলমানদের মনমরা উদাসভাব চেহারায় ফুটে আছে,অন্তরে অতৃপ্তি লেগে আছে।একসাথে সকলের ললাটের প্রেমময় সাজদাহ এখন একাকী করতে হচ্ছে! মসজিদে যেতে না পারার মনোকষ্টে অনেকে নিরবে চোখের অশ্রু ফেলে।মুয়াজ্জিনের কান্নাভেঁজা কন্ঠে আযানের ধ্বনি অন্তরে ধাক্কা লাগে।রমজান এলে মুসলমানদের ইবাদতের মাত্রা বাড়ে।অলস ও গাফেলরাও চৈতন্য ফিরে পায়।তাই করোনা সময়ের রমজানে দু:খবোধ বেশি কাজ করছে।দু:খ বুকে পোষে রাখলে হবে না,ঘরে ঘরে ইবাদতের উৎসব ও আমেজ গড়ে তুলতে হবে।

রমজানের অন্যতম ইবাদত তারাবিহ।পূর্ণাঙ্গ কুরআন তারাবিহ নামাজে তেলাওয়াত করেন হাফিজে কুরআন।কুরআনের মধুর বাণী মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেন মুসল্লিরা।দেহ-মনে শিহরণ জাগে কুরআনের মিষ্টি সুরে।
কিন্তু আজ মসজিদগুলোতে নেই জাঁকজমকপূর্ণ তারাবিহ’র আয়োজন।নেই মুসল্লিদের আবেগমাখা দৌড়ঝাঁপ,শিশু-কিশোরদের অবুঝ হৈ-হুল্লোড়। দেখা যাবে না তারাবিহর পর তরণদের চায়ের আড্ডা।হবে না ভালবাসাময় ইফতারের আয়োজন। করোনার ভয়াল থাবা এলোমেলো করে দিয়েছে সবকিছু।

মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে সবধরণের জনসমাগমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সরকার।ভীড় করা,জটলা বাঁধা নিষেধ।সঙ্গতকারণেই
মুসলমানদের সম্মিলিত সকল ইবাদতে জমায়েত হওয়া যাচ্ছে না।মানুষ ঘরবন্দী। শহর লকডাউন।দুয়ারে মরণঘাতী কোভিড-১৯। হিমশিম খাচ্ছে পৃথিবী।পরাজিত বিজ্ঞান। ভেঙে যাচ্ছে ধৈর্য্যের বাঁধ। কিচ্ছু করার নেই।সবাই তাকিয়ে আছে আকাশ পানে।আরশের মালিকের কাছে সমাধান খোঁজছে।প্রার্থনার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে প্রভুর দরবারে।অদৃশ্য এই অণুজীবকে নির্মূলে অদৃশ্য সত্তা আল্লাহর কাছে মাথা নত করতে হবে।

এমন দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে এবার রমজান এসেছে। কোরানাভাইরাস মহামারী তছনছ করে দিয়েছে মানুষের সকল আবেগ, ভালবাসা।এমন কঠিন দু:সময় পৃথিবীবাসী দেখেনি আর।একসাথে সারা বিশ্ব অবরুদ্ধ।

এমনই এক ভয়াবহ সময়ে রহমত,মাগফেরাত ও নাযাতের পয়গাম নিয়ে এলো রমজান।বরকত ও কল্যাণের দুয়ার খুলে রমজানে।জন্নাতের দরজা উন্মুক্ত হয় এ মাসে।শয়তান তালাবদ্ধ থাকে।জাহান্নামের দ্বার বন্ধ হয়ে যায়।রমজান মহিমান্বিত ও শ্রেষ্ঠ সময়।আল্লাহর দয়া ও রহমত সম্প্রসারিত হওয়ার এই শুভমূহুর্তে দু:সময়ের বিদায় ঘটবে,ইনশা-আল্লাহ।মানুষ ফিরে পাবে স্বাভাবিক জীবন যাত্রা।থমকে যাওয়া পৃথিবী আবারও ব্যস্ত হয়ে পড়বে,কেটে যাবে অচলাবস্থা।চলে যাবে দুর্দিনে,আসবে সুদিন।মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দিবেন।বিপদ-বিপর্যয় আল্লাহর হুকুমে আসে, তাঁরই নির্দেশে বিদায় হয়।মুসলমানরা হতাশ হবে না,ধৈর্য্যহারা হবে না,আশায় বুক বাঁধবে।সন্তুষ্ট থাকবে আল্লাহর ফায়সালায়।

রমজানের বরকতময় দিবস-রজনীকে কাজে লাগাতে হবে।ইবাদতে বিলিয়ে দিতে হবে নিজেকে।বান্দার প্রতি আল্লাহর ক্রোধকে নিভিয়ে দিতে হবে ইবাদতের মাধ্যমে।আল্লাহকে আমাদের খুশী করতেই হবে।পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করতে হবে আল্লাহর কাছে।দয়াময় আল্লাহ এই দুর্যোগকাল উঠিয়ে নিবেন।অবরুদ্ধ মানুষ ফিরে পাবে স্বাভাবিক জীবন।
লেখক:সম্পাদক, ভয়েসটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *