করোনা রোধে কোয়ারেন্টাইন আইসোলেশন লকডাউনের উদ্ভাবক ইসলাম

ইসলাম

•মুহাম্মদ মাহবুবুল হক•

থমকে আছে পৃথিবী।জীবন যাপন এখন গৃহবন্দী। পুরো পৃথিবী জনবিচ্ছিন্ন।জনজীবনে হতাশা ও দু:শ্চিন্তা।বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল।করোনাভাইরাস নামক অদৃশ্য অণুজীব কেড়ে নিচ্ছে হাজার হাজার প্রাণ।প্রতিদিন মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।

তাই বিশ্বজুড়ে এখন আতঙ্কের নাম করোনাভাইরাস। অদৃশ্য এক শক্তির কাছে হার মানছে সবাই।আতঙ্কিত না হয়ে উপায় নেই কোন। জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত ৬ লাখ ০২ হাজার ২৬২ জন,মারা গেছেন ২৭ হাজার ৮ শত ৮৯ জন। আইইডিসিআর -এর তথ্যমতে,এই পর্যন্ত বাংলাদেশে আক্রান্ত হয়েছে ৪৯ জন,মৃত্যু হয়েছে ৫ জনের।

বৈশ্বিক এ মহামারীর কবলে গোটা বিশ্ব।এই ভাইরাস প্রতিরোধে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা হিমশিম খাচ্ছেন। প্রতিষেধক ও আবিষ্কার হয় নি এখনো।কোভিড-১৯ নামের এই রোগটি ছোঁয়াচে।একজন থেকে আরেকজনে সংক্রমণ হয়।তাই চিকিৎসকরা সংক্রমণ রোধে কিছু নির্দেশনা ও ব্যবস্থা নির্ধারণ করেছেন।আধুনিক পরিভাষার এই উপায়গুলো তাই এখন মানুষের মুখে মুখে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের নির্ধারিত নিয়মাবলী অনুসরণে করোনা আক্রান্তরা অন্যকে রোগাক্রান্ত করতে পারেন না। সেই নিয়ম ও উপায়গুলোর মধ্যে অন্যতম কয়েকটি হলো:

এক.সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং বা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা।

এর মানে হলো, “আপনি অকারণে বাইরে যাবেন না। ঘরে থাকবেন। কোনো জরুরি প্রয়োজনে যেমন খাবারদাবার বা ওষুধ কিনতে বাইরে যেতে পারেন। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন।অসুস্থ বা সুস্থ সবাই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হয়”

দুই. আইসোলেশন বা বিচ্ছিন্ন থাকা

যাঁরা দেশের বাইরে থেকে এসেছেন বা সম্ভাব্য রোগীদের সংস্পর্শে এসেছেন বা নিশ্চিতভাবে করোনায় আক্রান্ত মানুষের সঙ্গে মিশেছেন, তাঁরা নিজেদের নিজের ঘরে আলাদা রাখবেন। তাঁরা কাউকে স্পর্শ করবেন না। নিজেদের স্বাস্থ্য নিজেরা পর্যবেক্ষণ করবেন। জ্বর মাপবেন। গলায় ব্যথা হচ্ছে কি না দেখবেন। যাঁরা জ্বর অনুভব করছেন, গলায় ব্যথা অনুভব করছেন, শ্বাসকষ্টে ভুগছেন, তাঁরাও আইসোলেশনে থাকবেন। মানে বিচ্ছিন্ন থাকবেন।

আপনি যদি একা থাকেন, সাত দিন নিজেকে মনিটর করুন। যদি পরিবারের সঙ্গে থাকেন, ১৪ দিন সবাইকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হবে। পরিস্থিতি বুঝে ১৪ দিন পর চলাচল করতে পারবেন বা পারবেন না।

তিন.কোয়ারেন্টিন বা সংগনিরোধ

এটা তাঁদের জন্য, যাঁরা করোনাভাইরাস টেস্টে পজিটিভ বলে পরীক্ষিত হয়েছেন বা টেস্ট করতে দিয়ে রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছেন। তাঁরা ঘরে থাকবেন। তাঁদের সংস্পর্শে কেউ যাবে না। যিনি যাবেন, তাঁকে অবশ্যই বিধিমোতাবেক প্রস্তুতি, সাবধানতা অবলম্বন করে যেতে হবে। কোয়ারেন্টিনের মেয়াদ ১৪ দিন ।

চার. হোম কোয়ারানটাইনের বাংলা অর্থ স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি

আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিধি (আইএইচআর -২০০৫)-এর আর্টিকেল ৩২ অনুসারে, যে সব দেশে নভেল করোনাভাইরাস বা (কোভিড-১৯)-এর স্থানীয় সংক্রমণ ঘটেছে সে সব দেশ থেকে যে সব যাত্রী এসেছেন এবং আসবেন (দেশি-বিদেশি যে কোনো নাগরিক), যারা দেশে শনাক্ত হওয়া কোভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসেছেন এবং যার অথবা যাদের কোনো শারীরিক উপসর্গ নেই, তাদের ১৪ দিন কোয়ারানটাইন পালন করা আবশ্যক।

পাঁচ.লকডাউন বা অবরুদ্ধাবস্থা

ক্যামব্রীজ ডিকশনারিতে বলা হয়েছে, কোনো জরুরি পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষকে কোনো জায়গা থেকে বের হতে না দেয়া কিংবা ওই জায়গায় প্রবেশ করতে বাধা দেয়াই হলো ‘লকডাউন।’ এছাড়া অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারিতে বলা হয়েছে, জরুরি সুরক্ষার প্রয়োজনে কোনো নিদিষ্ট এলাকায় জনসাধারণের প্রবেশ ও প্রস্থান নিয়ন্ত্রণ করাই ‘লকডাউন।’ এটা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নয়। এটা প্রশাসনিক বা আইনগত বা সরকারি ব্যবস্থা। এর মানে হলো, বিমান বন্ধ, সীমানা বন্ধ, চলাচল বন্ধ। রাস্তাঘাট বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। এটা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত, নাগরিকের স্বতঃপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত নয়। কর্তৃপক্ষ যা বলবে, তা শুনতে হবে।

সামাজিক দূরত্ব বা সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং বজায় রাখা। বারবার সাবান-পানি দিয়ে ২০ সেকেন্ড পরিমাণ সময় নিয়ে হাত ধোয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা–নির্দেশিত পদ্ধতিতে হাত ধোয়া। চোখ, নাক ও মুখে হাত না দেওয়া।এই নিয়মগুলো করোনাভাইরাস প্রতিরোধে খুব জরুরী। (সূত্র: বিবিসি, এনপিআর, প্রথম আলো, টিভিও অনলাইন)

দুই

ইসলামে সংক্রামক ব্যাধি বা ছোঁয়াচে রোগকে অস্বীকার করে না।হাদীসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

‘সিংহের আক্রমণ থেকে যেভাবে পলায়ন কর কুষ্ঠরোগী থেকেও সেভাবে পলায়ন করো।’ (সহিহ বুখারি)

অপর হাদীসে আছে, হযরত উমর রা. থেকে বর্ণিত,রাসূল স. বলেছেন,যে ব্যক্তি রোগাক্রান্ত বা কোন বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেখে “আলহামদুলিল্লাহিল্লাযি আফানি মিম্মাবতালাকা বিহী ওয়া ফাদ্দ্বালানি আলা কাছীরিম মিম্মান খালাকা তাফদিলা”দোয়াটি পড়বে,সে তার জীবদ্দশায় উক্ত রোগ বা মুসিবত-বিপর্যয় থেকে নিরাপদ থাকবে।(তিরমিজি)। এ হাদীস থেকে ও রোগ সংক্রমণের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

কিন্তু অন্য হাদিসে আছে,রাসূল (সা.) বলেন, ‘রোগ সংক্রমণম বলতে কিছু নাই।’ [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৭০৭]

এমন সব হাদীসের ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণ বলেন, ইসলাম রোগ সংক্রমণকে অস্বীকার করে না। তবে যে সকল হাদিস থেকে রোগ সংক্রমিত না হওয়ার বিষয়টি বুঝা যায় সে সকল হাদিসে রাসূল (সা.)মূলত জাহেলি যুগের একটি ভ্রান্ত বিশ্বাসের অপনোদন করেছেন। জাহেলি যুগে লোকদের বিশ্বাস ছিলো, কিছু রোগ নিজে নিজে সংক্রমণের ক্ষমতা রাখে।

অথচ বাস্তবতা এমন নয়। কোনো রোগই নিজে নিজে সংক্রমণের ক্ষমতা রাখে না।বরং আল্লাহ তাআলা সেই রোগের মধ্যে ক্ষমতা দেয়ার কারণেই তা সংক্রমিত হতে পারে।

মুসলমানদের মৌলিক আক্বিদা-বিশ্বাস থাকতে হবে,কোন রোগের সংক্রমণ হওয়ার নিজস্ব ক্ষমতা নেই। আল্লাহই একমাত্র রোগদাতা ও আরোগ্যদাতা।

“যখন আমি অসুস্থ হই,তখন তিনিই(আল্লাহ) আমাকে আরোগ্য দান করেন” সূরা: আশ-শুআরা -৮০।

চিকিৎসা বিজ্ঞান সংক্রামক রোগ বা মহামারীর প্রতিরোধের ক্ষেত্রে উপরোক্ত যে সব উপায় ও পদ্ধতির কথা বলেছেন,ইসলাম ১৪০০ বছর পূর্বেই সেসব নির্দেশনা মানবজাতিকে দিয়েছে।

মহামারী চলাকালে ইসলাম মানুষকে স্বস্থানে অবস্থান করতে উৎসাহ দিয়েছে

হযরত আয়েশা রা. বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মহামারি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, ‘এটা হচ্ছে আযাব। আল্লাহ তাআলা তার যে বান্দাদের উপর ইচ্ছা তা প্রেরণ করেন। আর মুমিনদের জন্য আল্লাহ সেটিকে রহমত বানিয়ে দেন। যখন কোনো এলাকায় মহামারি দেখা দেয় আর মুমিন ব্যক্তি সবর ও সওয়াবের নিয়তে এই বিশ্বাস রেখে নিজ এলাকাতেই ঘরে অবস্থান করে যে, আল্লাহ তার ভাগ্যে যা লিখে রেখেছেন তা ছাড়া কোনো কিছুই তাকে আক্রান্ত করতে পারবে না তাহলে সে শহীদের সওয়াব লাভ করবে।-সহীহ বুখারী ১/৪৯৪।এ হাদীসে কোয়ারেন্টাইনে থাকার উৎসাহ দেয়া হয়েছে।

অপর এক হাদীসের মাধ্যমে মহামারীর সময় লকডাউনের কথা পাওয়া যায়,. ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমির (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ‘উমার (রাঃ) সিরিয়া যাবার জন্য বের হলেন। এরপর তিনি ‘সারগ’ নামক স্থানে পৌঁছলে তাঁর কাছে খবর এল যে সিরিয়া এলাকায় মহামারী দেখা দিয়েছে। তখন ‘আবদুর রহমান ইবনু ‘আওফ (রাঃ) তাঁকে জানালেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমরা কোন স্থানে এর বিস্তারের কথা শোন, তখন সে এলাকায় প্রবেশ করো না; আর যখন এর বিস্তার ঘটে, আর তোমরা সেখানে অবস্থান কর, তা থেকে পালিয়ে যাওয়ার নিয়তে সেখান থেকে বেরিয়ে যেয়ো না। [সহিহ বুখারি:৫৭২৯]

মানবতার নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশনাকে উৎস বা সোর্স নির্ধারণ করে আজকের চিকিৎসা বিজ্ঞান সংক্রামক ব্যাধি প্রকিরোধকল্পে কোয়ারেন্টাইন, লকডাউন ইত্যাদি পদ্ধতির বা ব্যবস্থার উদ্ভাবন করেছে।ইতিমধ্যে মার্কিন গবেষকসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য গবেষকরা সেটা স্বীকার করেছেন।সার্বজনীন ধর্ম ইসলাম আল্লাহর উপর ভরসার পাশাপাশি মানবসম্প্রদায়কে সচেতন ও সতর্কতার শিক্ষা দিয়েছে। মহামারী আক্রান্ত এলাকা ও ব্যক্তির ব্যাপারে বহু বহু যুগ পূর্বে ইসলাম ধর্ম বেঁচে থাকার যে উপায় ও পদ্ধতি বলেছে,বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আজ তাই বলছে।করোনাভাইরাস সম্পর্কে যে সব স্বাস্থ্যবিধির কথা বলা হচ্ছে, ইসলাম ও সে কথা বলছে।পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে ইসলাম বেশি জোর দিয়েছে।

মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং ভালোবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদের।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২২২)

হাদিসেও বিভিন্ন উপায়ে পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং নানাবিধ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এমনকি পরিচ্ছন্নতা রক্ষাকে ঈমানের অংশ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আবু মালেক আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অর্ধেক।’ (মুসলিম, হাদিস নং: ২২৩)

করোনাভাইরাসে সাবান-পানি দিয়ে বারবার হাত ধৌত করার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে বলছেন।ইসলাম ও তাই বলে।পাঁচ বার নামাজে পাঁচ বেলা অজু করতে হয়।স্বাভাবিক অবস্থায় ও অজুর অবস্থায় থাকতে উৎসাহ দেয়া হয়।কিন্তু দু:খ হলো তবুও মুসলমানরা সচেতনতা ও সতর্কতা অবলম্বনে মনোযোগী না আজকের এই করোনার দু:সময়ে।গভীরভাবে চিন্তা করলে সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় করোনার এই সংকটময় মূহুর্তে ইসলামই সবচে বেশি প্রাসঙ্গিক।রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসা গ্রহণ, বেচেঁ থাকার উপায় ও পদ্ধতি অবলম্বন করা ‘আল্লাহর উপর ভরসার’ বিপরীত নয়।তাই আসুন! ইসলামের নির্দেশনা ও স্বাস্থ্যেবিধি মেনে করোনাভাইরাস থেকে বেঁচে থাকি।আল্লাহই সুরক্ষা দিবেন।

লেখক:সম্পাদক, ভয়েস টাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকম