কুরবানির ইতিকথা

ইসলাম

মুহাম্মাদ মাহবুবুল হক

কুরবানি সুপ্রাচীন একটি ইবাদত।এ ইবাদতের ধারা আদি যুগ থেকে চলে আসছে।যুগে যুগে বিভিন্ন উম্মতের মধ্যে কুরবানির প্রচলন ছিলো। কালের পরিক্রমায় উম্মতে মুহাম্মদির শরিয়াতেও কুরবানি ত্যাগের সবক নিয়ে এলো মানবজাতির কাছে।

আগেকার যুগের কুরবানির ধরণ ও প্রকৃতি ছিলো অন্যরকম।পৃথিবীতে কুরবানি প্রথার সূচনা হয় আদম আলাইহিস সালামের দুই তনয় হাবিল ও কাবিলের একটি কাহিনীর সূত্রধরে।আদম আলাইহিস সালামের সময়কার ঘটনা।পৃথিবীতে মানব বংশ বিস্তারের লক্ষ্যে আদম আলাইহিস সালামের স্ত্রী হাওয়া আলাইহাস সালামের গর্ভে জমজ সন্তান সৃষ্টি হতো।এভাবে এক গর্ভে জোড়া সন্তান প্রসব করতেন হাওয়া আলাইহাসসালাম।তৎকালে সাময়িক প্রয়োজন বিবেচনায় একই গর্ভের জমজ সন্তানকে সহোদর ভাই-বোন মনে করা হতো।একই মায়ের ভিন্ন গর্ভের ছেলে-মেয়ে কে সহোদর ভাবা হতো না।এটা ছিলো সে সময়ের বিধান।একই মায়ের এক গর্ভের সন্তান ভিন্ন গর্ভের সন্তানকে বিয়ে করতে পারতো।তবে একই গর্ভের ভাই-বোন পরস্পরে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করা বৈধ ছিলো না।হাবিলের সাথে জন্ম নেয়া বোন ছিলো অসুন্দর।কাবিলের জমজ বোন ছিলো পরমাসুন্দরী। নিয়ম মতো হাবিল কাবিলের সুন্দরী বোনকে বিয়ে করবে আর কাবিল হাবিলের কুশ্রী বোনকে বিয়ে করবে।কিন্তু কাবিল এ সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ।

স্রোতের উল্টো নিয়ম বহির্ভূতভাবে কাবিল চাচ্ছে তাঁর সুন্দরী আপন বোনকে বিবাহ করতে।এ সংকট ও সমস্যা দূর করার লক্ষ্যে হাবিল ও কাবিল কে নির্দেশ দেয়া হলো কুরবানি করার জন্য।যার কুরবানি আল্লাহর কাছে কবুল হবে,সে তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে।সে মতে উভয়ে কুরবানি করলো।তৎকালীন সময়ে কুরবানি কবুল হওয়ার প্রমাণ ছিলো, আকাশ থেকে অগ্নিকুণ্ড এসে কুরবানিকৃত বস্তুকে ভস্ম করে দিতো।যার কুরবানি কবুল হতো না, তা জমিনে পড়ে থাকতো।হাবিল একটি দুম্বা কুরবানি করেছিলেন,তার কুরবানি আল্লাহর কাছে মকবুল হলো।আর কাবিল খাদ্য-দ্রব্য কুরবানি করেছিলো, তা কবুল হয়নি।এ কাহিনীর পর ও কাবিল তার হঠকারী সিদ্ধান্তে অটল।সে আল্লাহর অবাধ্য হলো।কাবিল তার ভাই হাবিলকে বললো,আমি তোমাকে হত্যা করবো।হাবিল বললো,তুমি যদি আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হাত বাড়াও,আমি কিন্তু তোমাকে হত্যা করবো না।কুরবানি কবুল হওয়া না হওয়া হলো তাক্বওয়ার সাথে সম্পৃক্ত।আল্লাহ খোদাভীরু-মুত্তাক্বিদের কুরবানি কবুল করেন। অবশেষে আল্লাহর অবাধ্যচারী বিধান লংঘন করে কাবিল তার ভাই হাবিলকে হত্যা করলো।এটাই ছিলো মানব ইতিহাসে প্রথম কুরবানি। প্রথম কোন হত্যাকান্ড।এই কাহিনী থেকে জানা গেলো,কুরবানি অন্তরে লালিত তাকওয়ার নাম।আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহর নামে আত্মোৎসর্গ করাই কুরবানি।পশু কুরবানি তো একটি বাহ্যিক উপায়।কুরআনে স্পষ্ট বলা আছে,কুরবানির পশুর রক্ত,মাংস আল্লাহর কাছে পৌঁছে না।পৌঁছে কেবল তাক্বওয়া।কালে কালে সকল জাতি-গোত্রের জন্য কুরবানির বিধান ছিলো।কালক্রমে এলো ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের যুগ।ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম ছিলেন আল্লাহর বন্ধু।কাছের মানুষ।আল্লাহ তার কাছের লোককে বিভিন্ন পরিস্থিতির সম্মুখীন করে পরীক্ষা নিলেন।সবক’টি পরীক্ষায় ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম উত্তীর্ণ হন।তিনি মুসলিম জাতির পিতা।ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের অন্যতম পরীক্ষা ছিলো,প্রাণের চেয়ে প্রিয় হীরকতুল্য সন্তান ঈসমাইল আলাইহিস সালামকে জবাই করা।ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম স্বপ্নে দেখলেন তাঁর প্রিয় পুত্র ঈসমাইল আলাইহিস সালামকে জবাই করছেন।এভাবে তিন দিন স্বপ্ন দেখলেন।স্বপ্নের মাধ্যমে প্রাপ্ত আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য কালিজার টুকরো ঈসমাইল আলাইহিস সালামকে জবাইয়ের জন্য নিয়ে গেলেন মিনা প্রান্তরে।শাণ দেয়া ছুরি গলায় চালানোর পর ও ইব্রাহিম ইসমাইলকে জবাই করতে পারলেন না।

পরিশেষে ইসমাইলের পরিবর্তে কুরবানির জন্য জান্নাত থেকে এলো দুম্বা।ইব্রাহিম আ: পুত্রকে জবাইয়ের মনোবাসনা ব্যক্ত করার পর আল্লাহর নির্দেশ পালনে প্রফুল্ল মনে রাজি হয়েছিলেন ঈসমাইল আ:।পিতা-পুত্র উভয়ই আল্লাহর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন।ইতিহাসের মহান এই ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের বিরল ঘটনাকে স্মরণেই উম্মতে মুহাম্মদীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম কুরবানির নিয়ম চালু হয়।ইব্রাহিম আ.-এর সুন্নত ও আদর্শ কুরবানি।কুরবানি ইসলামের অন্যতম নিদর্শন। বিত্তবানদের উপর কুরবানি ওয়াজিব।নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,সামর্থ থাকার পরও যে কুরবানি করে না,সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।তাই আত্মত্যাগের মহান শিক্ষায় উদ্ভাসিত হয়ে হোক আমাদের কুরবানি।

লেখক:সম্পাদক,ভয়েসটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকম।