জামেয়া প্রতিষ্ঠা ও প্রিন্সিপালের রহ. যুগান্তকারী কয়েকটি পদক্ষেপ

ইতিহাস

শাহ মমশাদ আহমদ

সিলেট আলীয়া মাদরাসা হতে তাকমীল ফিল হাদীসে সারা দেশের মেধা তালিকায় স্থান অধিকারী মাওলানা হাবীবুর রাহমান রহ.। বিভিন্ন আলীয়া মাদরাসায় অধ্যক্ষ হওয়ার হাতছানি উপেক্ষা করে শায়খুল মাশায়িখ হযরত মাওলানা আব্দুল কারীম শায়খে কৌড়িয়ার রহ. নির্দেশে কাজির বাজারস্থ একটি ছোট মসজিদের ইমামতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

মসজিদের পার্শ্বেই ছিল একটি ডালিম গাছ।মসজিদের তরুণ ইমাম এ ডালিম গাছের নীচেই ১৯৭৪ সালের ৫ ই জুন কয়েকজন কোমলমতি শিশুদের নিয়ে গড়ে তুলেন একটি প্রতিষ্ঠান। ভিত্তিস্থাপন করে হযরত শায়খে কৌড়িয়া রহ. বলেন,দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ডালিম গাছের নীচে,এ মাদরাসাও বুনিয়াদ রাখা হচ্ছে ডালিম গাছের নীচে,তা এতদঞ্চলের দেওবন্দ হবে ইনশাআল্লাহ।

হযরত শায়খের অনুপ্রেরণায় তরুণ ইমাম মাওলানা হাবীবুর রাহমান হলেন অনুপ্রাণিত। ঘাত প্রতিঘাত,অপপ্রচার আর ষড়যন্ত্রের পাহাড় ডিঙ্গিয়ে গড়ে তুললেন আজকের বিশাল জামেয়া মাদানিয়া ইসলামীয়া কাজির বাজার।

প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকেই জামেয়া মাদানিয়া দ্বীন- ইসলামের বহুমুখী খেদমতে যুগের চাহিদা অনুযায়ী নিরলস কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।দাওয়াতে দ্বীনের ক্ষেত্রে প্রিন্সিপাল আল্লামা হাবীবুর রহমান রহ.প্রনয়ণ করেছেন অনেক দুরদর্শী কর্মসূচি,নিন্দা আর অপফতোয়ার তোয়াক্কা না করে গ্রহন করেছেন যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

তৎকালীন সময়ে অনেক উলামায়ে কেরামের নিকট তা শরীয়ত বিরুধী মনে হলেও বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে তা ধারণ করেই সেই আলেমগণই দ্বীনের তা’লিমী ও দাওয়াতী কাজ কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন নির্দ্বিধায়, আলহামদুলিল্লাহ।

দ্বীন ইসলামের স্বার্থে জামেয়া মাদানিয়া ও
মুজাহিদে মিল্লাত প্রিন্সিপাল আল্লামা হাবীবুর রহমান রহ.গৃহীত কয়েকটি দূরদর্শী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ তুলে ধরছি।

প্রিন্সিপাল -এর প্রচলন
মাদরাসা পরিচালকদের মুহতামীম বলার রীতি হলে ও জামেয়া মাদানিয়া প্রধান কে সর্বপ্রথম প্রিন্সিপাল হিসাবে অভিহিত করা হয়।এতে আধুনিক শিক্ষিতদের মধ্যে কাওমী মাদরাসার ইমেজ ও মর্যাদাবোধ সৃষ্টি হয়।মাশাল্লাহ এখন তো অনেকেই প্রিন্সিপাল হিসাবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন,অথচ প্রিন্সিপাল রহ. কে আজীবন মুহতামীম শব্দের রুহানিয়াত বিনষ্ঠের অভিযোগ সইতে হয়েছে।

আন্তর্জাতিক ইসলামী মহা-সম্মেলন
বার্ষিক জলছা,ওয়াজ মাহফিলের রেওয়াজ থাকলেও বিশ্ব বরেন্য ইসলামী ব্যক্তিত্বদের অংশ গ্রহনে আন্তর্জাতিক ইসলামী মহা- সম্মেলনের ধারা জামেয়া মাদানিয়ার মাধ্যমেই শুরু হয়েছে।

ইসলামী ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়
তৎকালীন সময়ে কওমী মাদ্রাসায় ইংরেজি তো দূরের কথা, বাংলা চর্চাও নিন্দনীয় ছিল।জামেয়া মাদানিয়া ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশী বাংলা,ইংরেজি,কারীগরী শিক্ষার সমন্বয় করে সিলেবাস প্রনয়ন করে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।ফলশ্রুতিতে আজও জামেয়ার ছাত্ররা আন্তর্জাতিকভাবে স্বমহিমায় প্রস্ফুটিত।

রাজনৈতিক সচেতনতা
শিক্ষার সাথে সাথে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে জামেয়ার ভূমিকা সর্বস্বীকৃত। প্রিন্সিপাল রহ. রাজনৈতিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক বামধারার রাজনৈতিক নেতাদের ও জামেয়ার বহুমুখী কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

বাংলা ভাষায় মাসিক আনোয়ারে মদীনা।
জমিয়তে তালাবার পরিবর্তে জামেয়া ছাত্র সংসদ।
ছাত্র সংসদের জি,এস,ও এ,জি,এস। (সাধারনত মাদরাসায় ছাত্র নাজিম বলা হয়)
ছাত্র সংসদ কর্তৃক বাংলা ও আরবী পাক্ষিক দেয়ালিকা।
ছাত্র সংসদের অভিষেক ও নবীন বরণ।
বার্ষিক শিক্ষা সফর।

ছাত্র সংসদ পাঠাগারে পত্রিকা পাঠের ব্যবস্থাপনা
(মাদরাসায় পত্রিকা পাঠ তো দুরের কথা, ছাত্রদের সমসাময়িক বিষয়ে অবগত হওয়াও নিষেধ ছিল)
ক্লাসে উর্দুর পরিবর্তে বাংলা দারস প্রদান।

কলেজ ছাত্র সংসদের সাথে সমান্তরাল আন্দোলন ও সংগ্রাম।
(কওমী ছাত্রদের আধুনিক শিক্ষার ছাত্রদের সাথে চলাফেরা বারন থাকলেও প্রিন্সিপাল রহ জামেয়ার ছাত্র সংসদের দায়িত্বশীলদের অন্যান্য কলেজ ছাত্র নেতৃত্বের সাথে মিলে ছাত্র অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অগ্রনী ভুমিকা পালনে সচেষ্ট থাকতেন,অনেক আন্দোলনে জামেয়ার ছাত্র নেতৃবৃন্দ নেতৃত্ব দিয়ে জামেয়ার সুনাম বৃদ্ধি করেছেন,স্কুল কলেজ ছাত্রদের মাঝে দ্বিনের আহ্বান পৌছে দেয়ার সুযোগ হয়েছে।)

মিডিয়ায় প্রমাণ্যচিত্র সহ সংবাদ প্রচার।
দ্বীনের মর্যাদা তুলে ধরার লক্ষে বরেন্য আলেমদের সম্বর্ধনা, মোটর শোভাযাত্রা।
মেহমানদের সম্মাননা।

গোলটুপির ব্যবহার
( কিশতি টুপিই হক্কানিয়তের মানদণ্ড ছিল সে সময় )

সৃজনশীল সুরে ইসলামী নাশিদ।
(বাংলা ইসলামী নাশীদকে নাজায়েয ভাবা হতো)

মহাসম্মেলনের প্রচারনায় তোরন- ব্যানার।
(মানুষের টাকা অপচয় হচ্ছে বলে অপপ্রচার হতো)

আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে প্রচারণা মাইকিং।
(সিনেমার মতো মাইকিং বলে তিরস্কার করা হতো)

যুগোপযোগী চিত্তাকর্ষক শ্লোগান।
(জামেয়া ছাত্রদের শ্লোগানে রুহানিয়াত না থাকার অভিযোগ শুনা যেতো, ১৯৯০ সালে প্রিন্সিপাল রহ কারাগারে থাকাকালীন আমরা শ্লোগান দিতাম,মাররে লাথি ভাঙ্গরে তালা,বন্দিশালায় আগুন জ্বালা,একটি কওমী মাদ্রাসার ছাত্রদের এমন শ্লোগান শুনে শিক্ষিত জনতা হত পুলকিত)

জামেয়ার সম্মেলনে হযরত প্রিন্সিপাল রহ. এর বাজেট প্রনয়ণ ও উপস্থাপন।
(বাজেট পুস্তিকা হাতে যখন হযরত প্রিন্সিপাল রহঃ দাড়াতেন,হাজারও মানুষের মধ্যে পিনপতন নিরবতা বিরাজ করতো,বাজেট বক্তৃতার পর পুস্তিকা সংগ্রহের জন্য মুহতামীম হাযরাত হুমড়ি খেয়ে পড়তেন)

সম্মেলন সজ্জ্বিতকরন।
বন্যা দুর্যোগে ত্রান বিতরণ।
সুসজ্বিত কার্যালয়।
নতুন ভঙ্গিমায় সম্মেলনের উপস্থাপনা।
ছাত্রদের সাদা সেলোয়ার ও কুর্তা পরিধান।
সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন, জাতীয় ও প্রতিষ্টানিক পতাকা উত্তোলন।
ছাত্রদের মধ্যে মেরাথন ও সাইক্লিং প্রতিযোগিতা।
ছাত্র, শিক্ষক,কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের হৃদ্যতায় বার্ষিক সম্মিলিত ভোজের আয়োজন।
জাতীয় দিবস উদযাপন।
জামেয়া মাদানিয়া কিন্ডারগার্টেন।
লাশ গোসলখানা।
আর্তমানবতার সেবায় জামেয়ার তত্বাধানে সেবা সংস্থা “মারকাজুল খায়রী”
ছাত্রদের ফ্রি মোটর ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ।
কম্পিউটার ল্যাব৷
জামেয়ার তত্বাবধানে কোরআন প্রশিক্ষন বোর্ড।
প্রাক্তন ছাত্র পরিষদ গঠন
(সাধারণত তানজীমে ফুযালা’র প্রচলন ছিল)
আসহাবে বদর ফান্ড।

প্রিন্সিপাল রহ প্রবর্তিত অনেক পদক্ষেপ এখন ব্যাপক প্রচলিত।আসহাবে বদর ফান্ড গঠন করে ব্যাপক অনুদান সংগ্রহ,সম্মেলনের প্রচারে তোড়ন নির্মান সহ অনেক ক্ষেত্রে জামেয়া ও পিছিয়ে পড়েছে, জামেয়ার অনেক সৃজনশীল প্রোগ্রাম প্রায় সব মাদরাসাই ফলো করছে, নতুন প্রজন্মের অনেকেই ভাবতেই পারবেনা,এগুলো হযরত প্রিন্সিপাল রহ সুচনা করেছেন। আলেম উলামার নিকট বর্তমানে সার্বিকভাবে গ্রহণ হওয়াতেই হুজুরের খুলুসিয়াত প্রমাণিত হয়।

জামেয়ার প্রতিষ্ঠাতা হযরত প্রিন্সিপাল রহ. আমাদের মাঝে নেই।পরতে পরতে অনুভুত হচ্ছে শুন্যতা কিন্তু বিদ্যমান আছে তার চেতনা, তা ধারন করেই বর্তমানে তাঁরই সাহেবজাদা স্নেহভাজন মাওলানা সামিউর রাহমান মুসার পরিচালনায় চলছে জামেয়া।
যুগ যুগান্তরে চলুক জামেয়ার অনন্যতা।মহান আল্লাহর দরবারে এই কামনা করছি।

জামেয়ার প্রতিষ্ঠাতা হযরত প্রিন্সিপাল (রহঃ) কে আল্লাহ জান্নাতুল ফেরদআউস নাসীব করুন।
আমাদের ইয়াতিম করে পরপারে চলে যাওয়া উস্তাদদের মধ্যে জামেয়ার নাজিমে তা’লিমাত আল্লামা আব্দুল মুহাইমীন রহঃ শিক্ষা সচিব আল্লামা নেজাম উদ্দিন রহঃ,মুহাদ্দিস খলিফায়ে ফেদায়ে মিল্লাত মাওলানা হাফেজ আতিকুর রহমান রহঃ , শায়খুল হাদীস আল্লামা ইসহাক রহঃ, মুহাদ্দিস মাওলানা গাউস উদ্দিন রহঃ,মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা আব্দুল মুমীত ডেউপাশী রহঃ, মুহাদ্দিস মাওলানা মুরতাজা হুসাইন কুলাউড়ী রহঃ, জামেয়ার দীর্ঘদিনের হিসাব রক্ষক, প্রখ্যাত দায়ী, জনাব সুয়েজ আফজাল খান রহঃ, জামেয়া ছাত্র সংসদের সাবেক জি,এস, শিক্ষক মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস রহঃ, ফাজিলে জামেয়া ও শিক্ষক মাওলানা হাফেজ আব্দুর রাহমান রহঃ প্রমুখ যারা জামেয়ার জন্য সাধনা করেছেন, জামেয়ার প্রতিষ্ঠা দিবসে সকলকে স্মরণ করছি,আল্লাহ তাদেরকে জান্নাতের উচু মাকাম দান করুন।
লেখক:সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামেয়া মাদানিয়া ইসলামীয়া কাজিরবাজার সিলেট।