দেখে এলাম ইউরোপের প্রথম পরিবেশবান্ধব ইকো মসজিদ

ভ্রমণ

মুফতি আতিকুর রহমান: আদিকাল থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন মসজিদে চলছে ব্যাপক সংস্কারমূলক কাজ। সেই সঙ্গে নিত্য-নতুন মসজিদও তৈরী হচ্ছে ।

এসি, দামিদামি কার্পেট, টাইলসসহ সকল ধরনের আধুনিক সরাঞ্জাম মসজিদগুলোতে যুক্ত হচ্ছে।

“মসজিদগুলোর যতই উন্নতি হচ্ছে, আধুনিকতার যতই ছোঁয়া লাগছে; ততই আমরা হেদায়াতের আলো থেকে ক্রমশঃ অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছি। তার বাস্তব প্রমাণ বর্তমান লন্ডনের বিভিন্ন মসজিদ কমিটির দাঙ্গা-হাঙ্গামা।

আর তারই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ এক দশকের পরিকল্পনায় নির্মিত ইউরোপের প্রথম ইকো মসজিদ গত ২৪ এপ্রিল বৃহস্পতিবার উদ্বোধন করা হয়।

লন্ডনের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার রোমসির মিল রোডে ১ একর জমির উপর ২৩ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করে নির্মাণ করা হয় এ মসজিদ। যাতে একসঙ্গে এক হাজার মানুষ জামায়াতবদ্ধ হয়ে নামাজ আদায় করতে পারবেন।

মাক বারফিল্ডের তৈরি নকশায় সবুজের সমারোহে কাঠ, ইট ও টাইলসের ব্যবহারে তৈরি করা হয় এক গম্বুজ বিশিষ্ট পরিবেশ বান্ধব ক্যামব্রিজ ইকো মসজিদ।

মসজিদের ব্যবস্থাপনা, ভেতরের অলংকরণ, অজুখানাসহ সব কিছুতেই রয়েছে নন্দনিকতার ছোঁয়া।

উদ্বোধনের দিন থেকে সোশাল মিডিয়াসহ চতুর্দিকে সাড়া জাগিয়েছে মসজিদটি। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন অনেকের মুখে শুনেছি এ মসজিদের কথা। বন্ধুবর মাওলানা আশরাফ ভাই অনেক দিন থেকে বলছেন এ মসজিদ ভিজিট করার কথা। কাজের ব্যস্ততার দরুন এতোদিন তার কথা রাখতে পরিনি, বর্তমানে হলিডেও বেড়ানোর মৌসুম, তাই তার কথায় রাজি হয়ে যাই। আমরাতো বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারনে অনেক জায়গায় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যেতে পারি না ।

মাওলানা হিফজুর রহমান ভাইয়ের তত্ত্বাবধানে মাওলানা মামুন ভাই ও জুয়েল ভাইসহ আমরা মঙ্গলবার সকাল ১০ ঘঠিকার সময় রওয়ানা হই জ্ঞান বিজ্ঞানের শহর ক্যামব্রিজের উদ্দেশে। লন্ডন থেকে প্রায় ১ঘন্টা ড্রাইভ করে আমারা পৌঁছলাম ক্যামব্রিজ ইকো মসজিদে ।

মসজিদের প্রবেশপথেই স্বচ্ছ পানির ফোয়ারা স্থাপন করা হয়েছে, যা সৌন্দর্যে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে।প্রবেশ পথে মসজিদ ক্লিনারের সাথে সাক্ষাৎ হলো। মসজিদের একজন খাদেম হিসেবে তিনি আমাদের সঙ্গে যে সৌজন্যতা প্রদর্শন করেছেন; তা ছিলো বেশ মনোমুগ্ধকর।তিনি আমাদেরকে সিকিউরিটির রুম দেখিয়ে বললেন আপনার ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলে উনার পারমিশন লাগবে।

সিকিউরিটির কাছে যেতেই আমাদের চোখ ছানাবড়া! কানে দুল আর হাতে ট্যাটুআকা ভদ্র লোককে সালাম করব না হাই বলবো, বুঝতে পারছিলাম না। তিনি বললেন, বিল্ডিং এখন বন্ধ। প্রেয়ার টাইমে খুলে দেয়া হবে। পরবর্তীতে তাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম তিনি ননমুসলিম, তার নাম টনি।

জুহরের নামাজ ১:৩০ মিনিটে। আমাদের হাতে সময় থাকায় নিকটস্থ পার্কে একটু ঘোরাঘুরি করে ১০ মিনিট পূর্বে আবার এসে হাজির হলাম। মসজিদের ফটক খুলে দেয়া হলো।এবার চেকপোস্টের লাইনে দাঁড়িয়ে একে একে সবাইকে বলা হচ্ছে, অযু করা যাবে না, জায়নামাজ আছে কি ? মাস্ক পরতে হবে, জুতা রাখার বেগ না হলে প্রবেশ করা যাবে না। টেম্পারেচার চেক করতে হবে, সেনেডাইজেশন ইউজ করতে হবে (যা ১০০% হালালও নয়) ইত্যাদি ইত্যাদি।

মসজিদে প্রবেশ করে দেখি, আমরা পাঁচ জনসহ আরো সাত জন। এর মধ্যে তিন জন দর্শনার্থী। এক হাজার লোকের ধারনক্ষমতা বিশিষ্ট মসজিদে মাত্র বার জন মুসাল্লি। শার্ট পেন্ট পরা দাড়ি বিহীন আধবয়সি একজন লোক ম্যানেজমেন্টে খুব ব্যস্ত। বার বার আমাদের কাছে এসে রুল রেগুলেশন বর্ণনা করে নিজেকে জাহির করার অপচেষ্টা করছেন তিনি এই মসজিদের মুতাওয়াল্লি।

এটাই হওয়ার কথা, প্রায় দেখা গেছে সারা জিন্দেগি হালাল-হারামের তোয়াক্কা না করে উপার্জন করে বড়লোক হয়ে শেষ বয়সে এসে মসজিদের মুতাওয়াল্লি। এ জন্যইতো মসজিদগুলোর ম্যানেজমেন্টের এই দুরাবস্হা।

ইমাম সাহেব আসলেন, মুখে নামেমাত্র দাড়ি । শার্ট প্যান্টের উপরে ওয়াসতাকবারা পরা।টাখনুর নিচে পেন্ট পরা অবস্থায় জুহরের নামাজের ইমামতি করলেন। নামাজ শেষে সৌজন্য সাক্ষাত হলো। পরিচয় দিলেন তিনি এই মসজিদের ইমাম ও খতিব। ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটিতে ইসলামিক স্টাডি করেছেন।

নামাজ শেষে ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রদর্শন করে এবার ঘরে আসার পালা।

লাঞ্চের জন্য হোটেলে গিয়ে দেখি বাইরে বিশাল লাইন। আর ভেতরে আদমি পর আদমি, সেখানে নেই কোনো সোশাল ডিসটেন্স, নেই মাস্ক নেই কোনো সেনেটাইজেশনের ব্যবস্থা। মানুষের সমাগম বাড়ানোর জন্য সরকার পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে ৫০% অফ এর অফার। যতসব রুল রেগুলেশন আছে, সব প্রয়োগ করা হচ্ছে একমাত্র মসজিদে। আল্লাহ মালুম , কি হচ্ছে এই সব!

জেআর;