দেশের প্রথম মসজিদ পুননির্মাণ ও জামে’ আস-সাহাবা কমপ্লেক্সের ভিত্তি স্থাপন

ইতিহাস ইসলাম

মুহাম্মদ মাহবুবুল হক : পৃথিবীর নানা প্রান্তে মুসলিম সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ছড়িয়ে আছে। বিশ্বের পূর্ব-পশ্চিম থেকে উত্তর-দক্ষিণ সবখানেই ইসলামের সভ্যতা ও আদর্শ পৌঁছে দিতে যুগে যুগে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন মুসলিম মনীষারা।তাই চেপে থাকা মুসলমানদের ঐতিহ্যের স্মারক ও স্মৃতিচিহ্ন বেরিয়ে আসে স্বগৌরবে।ইতিহাস-ঐতিহ্য চাপা পড়ে থাকে না।একটা সময়ে ঠিকই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে যায়। নিদর্শন ও স্থাপনা ঐতিহ্যের প্রতীক।অস্তিত্বের প্রমাণ।প্রাচীন স্থাপত্যে ভর করে শেকড়ের সন্ধান পাওয়া যায়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন ও স্থাপনা বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে সমুন্নত করে রেখেছে।এমন কাউকে পাওয়া যাবে না যে, ঐতিহ্য ভুলে যায়।সেই হারানো ঐতিহ্যের খোঁজে, শোকড়ের টানে মানুষ আবিষ্কার করে হারানো একটি মসজিদ। একটা সময় বাংলার সবুজ জমিনে হৃদয়সজিব করা ‘সাহাবা মসজিদ’ -এর সন্ধান মেলে। গতকাল ৩ ফেব্রুয়ারি (সোমবার) লালমনিরহাটের সেই ঐতিহাসিক সাহাবা মসজিদ পুননির্মাণ ও জামে’ আস-সাহাবা কমপ্লেক্সের ভিত্তি প্রস্তুর স্থাপন উপলক্ষ্যে ইসলামি মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ১১ টা থেকে জামে’ আস সাহাবা কমপ্লেক্স মাঠে লালমনিরহাটের ৭ নং পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সাহাবা মসজিদের সভাপতি মো: দেলওয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে প্রধান মেহমান হিসেবে উপস্থিত ছিলেন,রাসুল সা.-এর চাচা হজরত আব্বাস রাযি.-এর বংশধর ও ফিলিস্তিনের বায়তুল মোকাদ্দাস মসজিদে আকসার গ্র্যান্ড ইমাম শায়খ আলী উমর ইয়াকুব আল আব্বাসী।আরো উপস্থিত ছিলেন, জামেয়া মাদানিয়া ইসলামিয়া কাজির বাজারের ভাইস প্রিন্সিপাল, যুক্তরাজ্য প্রবাসী ইসলামিক স্কলার মাওলানা খতিব তাজুল ইসলাম,যুক্তরাজ্য প্রবাসী মাওলানা ফরিদ খান,যুক্তরাজ্য প্রবাসী মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মাওলানা সালেহ হামিদী।

বিভিন্ন সূত্রে সেই আলোচিত মসজিদের ইতিহাস জানা যায়, ঐতিহাসিক ‘হারানো মসজিদ’টি রংপুর-কুড়িগ্রাম মহাসড়কের এক কিলোমিটার দক্ষিণে লালমনিরহাট সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের রামদাস মৌজায় অবস্থিত।মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল প্রায় এক হাজার ৩৫০ বছর আগে ৬৯ হিজরিতে।৬৯০/৬৯১ খৃষ্টাব্দে।মসজিদটি ছিলো রামদাস গ্রামের একটি বন-জঙ্গল বেষ্টিত স্থানের ভেতর।ভুতুড়ে পরিবেশ।আড়ার জঙ্গল।স্থানীয় লোকজন হিংস্র জীবজন্তু, সাপ-বিচ্ছুর ভয়ে সেখানে প্রবেশ করার সাহস করতো না।জায়গাটি ছিলো পরিত্যক্ত বনভূমি। চাষাবাদের উপযোগী করার জন্য গ্রামের মানুষজন ১৯৮৩-৮৪ সালে সেই জঙ্গল পরিচ্ছন্ন করার উদ্যোগ নেয়। ঝোঁপঝাড় পরিষ্কার করতে গিয়ে দেখা মেলে সাত-আটটির মতো মাটির উঁচু টিলা। টিলা কেটে সমতল করার জন্য মাটি খোঁড়া শুরু হলে সেখানে প্রাচীনকালের প্রচুরসংখ্যক নান্দনিক ফুল সমৃদ্ধ ইট পাওয়া যায়।
১৯৮৬ সালের একদিনের চাঞ্চল্যকর ঘটনায় সবার টনক নড়ে।গ্রামের আইয়ুব আলী নামের এক লোক স্তুপ থেকে ইট কুড়িয়ে এনে পানি দিয়ে পরিস্কার করে দেখেন প্রাচীন শিলালিপিতে লেখা আছে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ, হিজরি সন ৬৯’। ৬৯ হিজরিতেই বাংলাদেশে ইসলাম আগমনের রাজসাক্ষী হিসাবে মসজিদটি দাঁড়িয়ে আছে।
এই মসজিদটিই সাহাবা মসজিদ নামে পরিচিত। রাসূলের সা. মামা বিবি আমেনার চাচাতো ভাই আবু ওয়াক্কাস রা. বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার করেন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এই মসজিদটি নির্মাণ করেছেন মহানবী হজরত মোহাম্মদ সা.-এর সাহাবী হজরত আবু ওয়াক্কাস রা.। তিনি ইসলাম প্রচারের জন্য এই অঞ্চল দিয়ে চীনে যান। চীনের বিস্মৃত কোয়াংটা নদীর ধারে কোয়াংটা শহরে তাঁর নির্মিত মসজিদ ও সমাধি আছে।
এ সূত্র থেকেই ধারণা করা হয় যে, ৬৯০ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদটি আবু ওয়াক্কাস রা. নির্মাণ করেন।বাংলাদেশের সর্বপ্রথম ও প্রাচীন এই মসজিদটির উত্তর-দক্ষিণে ২১ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১০ ফুট। মসজিদের ভেতরের পুরুত্ব সাড়ে ৪ ফুট।
ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক টিম স্টিল এবং আমেরিকান প্রত্নতাত্ত্বিক দল আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব আর্কিওলজিস্ট ইট ও শিলালিপি পরীক্ষা নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছে সেটা ৬৯ হিজরী সনের হতে পারে।আল-জাজিরাসহ বিশ্বগণমাধ্যমে সাহাবা মসজিদ নিয়ে প্রতিবেদন হয়েছে।প্রত্নতাত্তিকদের অনুসন্ধান মতে, এটিই বাংলাদেশের প্রথম মসজিদ।
অবহেলিতভাবে পড়ে থাকা মুসলমানদের পবিত্রতম ঐতিহ্যের স্থাপনা ‘সাহাবা মসজিদ’কে নতুন আঙ্গিকে আধুনিক স্থাপত্যশিল্পের ধাঁচে নান্দনিক রূপে পুননির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন খতিব তাজুল ইসলাম ও তাঁর সহযোগী কয়েকজন আলেম । ৩ ফেব্রুয়ারি সোমবার পুননির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়।সিলেটের কৃতিসন্তান বৃটেন প্রবাসী খতীব মাওলানা তাজুল ইসলাম সবার পরিচিত ব্যক্তিত্ব।ইসলামের কল্যাণে নানামুখী কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বিভিন্ন সেবামূলক ও সমাজিক কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।খতীব তাজুল ইসলাম বলেন, ঐতিহ্যবাহী আলোচিত সাহাবা মসজিদকে আমরা একটি যুগপোযোগী প্রতিষ্ঠান রূপে প্রতিষ্ঠা করতে চাই। মসজিদ কমিটি ও বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরামের সাথে সমন্বয় করে জামে’ সাহাবা কমপ্লেক্স নির্মাণে আমরা বদ্ধ পরিকর।নির্মাণ কাজের ভিত্তি স্থাপন হলো। তিনি আরও বলেন, মসজিদের পাশাপাশি দেশের একটি বৃহৎ ইসলামিক সেন্টার হবে এই কমপ্লেক্স। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, এ সাহাবা মসজিদের কাজ শেষ না করে যেন আমার মরণ না হয়।