নক্ষত্রের দানাভরা বইয়ের আকাশ

শিল্প ও সাহিত্য

কাজী আকরাম

বইয়ের ক্যাটাগরি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ষোড়শ শতকের নামজাদা মনীষী ফ্রান্সিস বেকন বলেছিলেন, কিছু বইকে গিলে ফেলতে হয়, আর কিছু বই কে চিবিয়ে হজম করতে হয়। যার মানে হচ্ছে, কিছু বইয়ের অংশবিশেষ পড়লেই চলে; কিছু বই পড়তে হয়, তবে খুব বেশি সময় নিয়ে নয়; আর কিছু বইয়ের পুরোটা পড়তে হয় এবং তা যথেষ্ট অধ্যবসায় ও মনোযোগ এর সাথে।

তার বিশ্লেষণকে আমলে নিয়ে ‘নক্ষত্রচূর্ণ’ বইটিকে তিন নম্বর ক্যটাগরিতে রেখেই আমি বলবো, নক্ষত্রচূর্ণ বইটি হচ্ছে তেমন ধারার বই, যার পাঠ অংশবিশেষ নির্ভর কিংবা নজর উড়িয়ে নয়, বরং যাকে আগাগোড়া পড়তে হবে, যথেষ্ট অধ্যবসায় আর গভীর মনোযোগ মিশিয়ে। যাকে পড়তে হবে ধরে ধরে। এগুতে হবে ধীরে ধীরে। বুঝে-সুঝে। ভেবে-চিন্তে। না হয়, আর যাই হোক, এ বই পাঠের যে ‘হক’, তা আদায় হবে না আদৌ!

বক্ষমাণ বইটিতে পাঁচটি অধ্যায় সন্নিবেশিত হয়েছে।

নক্ষত্রচূর্ণ, উড়ন্ত সাক্ষাৎকার, বোধির বৃষ্টিজল, প্রকৃতির পাঠশালা এবং কথা ও কণিকা।

নক্ষত্রচূর্ণ…

জ্ঞান, প্রজ্ঞা, চিন্তা এবং অভিজ্ঞতা থেকে উৎসারিত এমন অনেক মর্মসমৃদ্ধ কথামালার সমাহার ঘটেছে বইয়ের এ অধ্যায়ে, যেগুলোর ব্যাখ্যা ও বিস্তার ঘটালে একেকটা আস্ত বইয়ের রূপ নিতে পারে। কিন্তু, লেখকের দার্শনিক মনীষার আশ্চর্য মুনশিয়ানায় সেসব কথা পরিবেশিত হয়েছে মাত্র দু’য়েক বাক্যে। এটা লেখকের অল্পকথায় বিশাল অনুভুতির প্রকাশক্ষমতাকেই প্রমাণ করে। অনুভবের গভীর-নিবিড় সত্যকে প্রজ্ঞাময় উপস্থাপনের বৈশিষ্ট্যেরই প্রতিনিধিত্ব করে। লেখক যাকে অভিধা দিয়েছেন ‘নক্ষত্রচূর্ণ’ এবং এ-ই নামেই গ্রন্থনাম রেখেছেন।

বোধির বৃষ্টিজল…

বোধির বৃষ্টিজল পড়তে গিয়ে আপনার মনে হবে, যেন আপনি গল্প টাইপ কিছু পড়ছেন। অথচ, বাস্তবতা হল, গল্পের নেপথ্যে নিহিত আছে কোনো দার্শনিক তত্ত্ব;কোনো গভীর তাৎপর্যপূর্ণ সত্য। যে তত্ত্ব দারুণ শিল্প-কুশলতায় উপস্থাপন করেছে দেশ ও সমাজকে, সমকালের প্রেক্ষাপটে। যে সত্য উম্মোচন করেছে জীবন ও জাতির বর্তমান সংকট এবং ভবিষ্যত সম্ভাবনাকে। ফলে এ বইয়ের সচেতন এবং সুচিন্তিত পাঠ পাঠককে দেয় সার্বিক উত্তরণের দিশা। দেখায় আত্মসম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলার সড়ক।

প্রকৃতির পাঠশালা…

মানবজাতির শিক্ষা গ্রহণ করার পক্ষে অনেক মাধ্যম আল্লাহ তা’য়ালা দিয়ে রেখেছেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য শিক্ষালয় হচ্ছে পৃথিবীর প্রাণী ও প্রকৃতি। কিন্তু, কথা হল, মানুষ চিন্তা করে না। চিন্তা করতে ভুলে যায় কিংবা ভুল চিন্তা করে। প্রায়ই চিন্তার মারফত শেষতক কোন ফলাফল লাভ করতে পারে না। ‘প্রকৃতির পাঠশালায়’ জীবনবোধের সূক্ষ্ম ভাষ্যকার এই লেখক প্রকৃতি নিয়ে ‘চিন্তা করা’ ও ‘চিন্তা করতে জানা’ এবং ‘চিন্তার সুত্র ধরে শিক্ষা ও সবক নেয়া’রই এক ইন্টেলেকচুয়াল বয়ান হাজির করেছেন। যার পাঠ জীবনভাবনাকে করে জাগরিত। চিন্তাশক্তিকে করে প্রসারিত।

উড়ন্ত সাক্ষাৎকার…

এখানে ব্যক্তি মুসা আল হাফিজ এবং দার্শনিক মুসা আল হাফিজের পারস্পরিক আলাপের মাধ্যমে বিচিত্র বিষয়ের জবাব-জিজ্ঞসার এক ‘চিন্তাধর্মী সাক্ষাৎকার’ সন্নিবেশিত হয়েছে। এটি পাঠ করে আমার মনে হয়েছে, যেন আমি নিজের ভেতরকে জর্জরিত করা অনেক রোগ-শোকের ওষুধ খুঁজে পেয়েছি। মনের কোণে জমে থাকা অনেক অস্বস্তিকর প্রশ্নের উত্তর পেয়েছি। পেয়েছি অনেক নবতর চিন্তার খোরাক। পেয়েছি জীবন বাস্তবতার অনবদ্য স্বাদ । আমি কেন, যে কোন পাঠকই তার নিজের মতো করে উপকৃত হওয়ার অবকাশ রয়েছে দার্শনিকসুলভ এই সাক্ষাৎকার থেকে। কারণ, দার্শনিক মুসা আল হাফিজ কেবল একা একজন ব্যক্তিমাত্র নন, তিনি হয়ে উঠেন সমষ্টির কণ্ঠস্বর ।

কথা ও কণিকা…

শেষমেশ পাঠকদের জন্য রয়েছে আরেকটি উপহার। জগৎবিখ্যাত বিদ্বান মুনি-মনীষীদের সঙ্গে লেখক তাঁর কল্পনার আলোকে আলাপে জড়িয়েছেন। তাদের সাথে সংলাপ জমিয়েছেন। শিক্ষার্থী হয়ে তাঁদের জ্ঞান ও চিন্তার শস্য আহরণ করে কালের ভাষায় আমাদের সামনে হাজির করেছেন। আপন সময় ও সমাজের রোগ ও সংকটের বিচিত্র বিষয় সম্পর্কে তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছেন। এবং সেসবের সমাধানকল্পে তাদের সুচিন্তিত পরামর্শ ও পরিকল্পনাকে তাদের জবান দিয়ে ব্যক্ত করিয়েছেন। আফটার অল, এ বইয়ে আছে আরও অনেক, অনেক কিছু…

বইটি সম্পর্কে লেখকের একটি মৌখিক মন্তব্য ছিল এমন— ‘এটা একটা সুরঙ্গের মতো, যেখানে মানুষের মস্তিষ্ক প্রবেশ করে। আর দেখতে পায় ভিন্ন এক জগৎ।’

হ্যাঁ পাঠক, এই বইটি হাতে নিয়েছেন মানে একটি অনিঃশেষ সুরঙ্গের ভেতর আপনি ইতিমধ্যে আপনার মস্তিষ্ককে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। যেখান থেকে সহজেই আপনার বেরিয়ে আসার সুযোগ নেই!

বইটি প্রকাশ করেছে ‘মনোজ’। প্রচ্ছদ, ছাপা, অঙ্গসজ্জা ও বাঁধাই সুন্দর। পাঁচ ফর্মার বইটির মূল্য লেখা হয়েছে মাত্র ২০০ টাকা। বইটি পাওয়া যাচ্ছে একুশে গ্রন্থমেলার চৈতন্য ২৫০-২৫১ নম্বর স্টলে।

জেআর/