নবীজিকে স. প্রাণের চেয়েও বেশি ভালবাসতে হবে

ইসলাম

মুফতি সৈয়দ নাছির উদ্দীন আহমদ

মহান আল্লাহ মুমিনদের প্রতি বড় অনুগ্রহ করেছেন; তিনি তাদেরই নিজেদের মধ্য হতে তাদের নিকট রাসূল প্রেরণ করেছেন। যিনি তাদের সামনে আল্লাহর আয়াত সমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেন, যদিও তারা এর আগে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত ছিল। (সূরা আলে ইমরান : ১৬৪)

নবী কারীম (সা:) নবীগণের সর্দার তেমনিভাবে মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবেও তিনি সকলের চেয়ে মহান। তিনি এমন এক উৎকৃষ্ট সমাজ রেখে গেছেন, যার নজীর পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে পরবর্তীরাও উৎকর্ষের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারে।

সেই মহান পুরুষ সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মহা মানব বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর প্রতি সর্বাধিক ভালোবাসা মুমিনের ঈমান শিরোনামে অধমের সংক্ষিপ্ত আলোচনা ।

হাদীসের ভাষ্য থেকে আমরা জানতে পারি যে, প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) কে সবকিছুর উর্ধ্বে অর্থাৎ আপন সন্তান, পিতা-মাতা সহ সকল মানুষ এমনকি নিজের জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসতে হবে । এর  কারণ হলো চারটি!

(১) جمال বা সৌন্দর্য ।
(২) كمال বা পরিপূর্ণ  ।
(৩) نوال বা এহসান ।
(৪) قرابت বা নৈকট্য ।

আল্লাহ পাকের সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্য যে জাতি তারা হল মানুষ । আর আদম সন্তান সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ হিশেবে যেমনি স্বিকৃতি তেমনি তাদের সৃষ্টির সেরা সৌন্দর্য হওয়ার বিষয়টিও স্বিকৃতি । এটা স্বয়ং রব্বে কারীম মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষণা ।

আল্লাহ পাক তার প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যেই রেখেছেন এক বিশেষ আকর্ষণ। এতে আকর্ষিত হওয়ার একটি কারণ হচ্ছে সুদর্শন বা সুন্দর আকৃতি বিশিষ্ট হওয়া ।কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর প্রতি কখনো সৌন্দর্যের কারণে মহব্বত সৃষ্টি হয়।মানুষ সৌন্দর্যের কারণে একে অন্যের প্রতি যেমনি আশিক হয়, তেমনি অন্য প্রাণীও সৌন্দর্যের প্রতি আশিক হয়ে যায় ।

যেমন; কিছু পাখী এমন রয়েছে যেগুলো চাঁদের সৌন্দর্যের প্রতি আশিক ও প্রেমিক হয়ে থাকে ।
ফড়িং ও পতঙ্গ এগুলোও বাতি বা প্রদীপের আলোর প্রতি এমনভাবে আশিক হয় কখন বাতির আলোতে পতঙ্গ নিজের জান পর্যন্ত কুরবান করে দেয়। যদিও এগুলো তা বুঝতে পারেনা । কারণ ওরা জ্ঞানহীনপ্রাণী ওদের মধ্যে সেই অনুভূতি বা বুঝ শক্তি বিদ্যমান নেই ।

আমরা জানি কারো মধ্যে সৌন্দর্য থাকলে তার প্রতি মহব্বত সৃষ্টি হয় । এটিও ভালোবাসা সৃষ্টির অন্যতম একটি কারণ। আমাদের প্রিয় নবীজি (সা:) হলেন মহান রবের সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্যের অধিকারী একজন মহান পুরুষ।যার সৌন্দর্যের কোনো তুলনা নেই ।কেননা আল্লাহ পাক বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) কে সমস্ত সৃষ্টিজগতের মধ্যে সর্বাধিক সৌন্দর্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন । তা কেনইবা করবেন না যখন মহান আল্লাহ পাক তাকে নিজের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু বানিয়েছেন।

তাছাড়া রাসুলের প্রতি ঈমান আনা প্রতিটিমুসলমানের জন্য যেমন আবশ্যক, তেমনি তার প্রতি পূর্ণভালোবাসা দেখানো গুরুত্বপূর্ণ একটি মৌলিক বিষয় । এজন্যই রাসুলুল্লাহ(সা:)এর প্রতি আমাদের প্রেম প্রীতি ভালোবাসা সবার চেয়ে বেশী হতে হবে । শুধু তাই নয় বরং তা আবশ্যকও বটে, নতুবা ঈমান পূর্ণাঙ্গ হবেনা । যেমনটি রাসুলের বাণীতে বলা হয়েছে । হাদীসটি হল;
لا يؤمن أحدكم حتى اكون احب إليه من والده وولده
والناس أجمعين

হযরত আনাছ(রা:)থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ (পূর্ণ বা প্রকৃত) মুমিন হতে পারবেনা যতক্ষন না সে তার মাতা-পিতা, সন্তান ও সকল মানুষের চেয়ে আমাকে অধিক ভালোবাসবে।

হাদীসের মধ্যে কোন প্রকার ভালোবাসা উদ্দেশ্য অর্থাৎ আকলি মহব্বত নাকি স্বভাজাত ভালোবাসা উদ্দেশ্য এনিয়ে মুহাদ্দীসীনগণের কিছু মতবিরোধ রয়েছে। অধিকাংশ মুহাদ্দীসীনের মতে হাদিসে আকলি মহব্বত উদ্দেশ্য যা হলো ঐচ্ছিক।যাতে ভালোবাসা কখনো অবসান ও বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে । তাছাড়া মহব্বতে ত্ববয়ী কখনো কোনো কারনে বিলুপ্ত হয়ে যায় ।

অথচ রাসুলের প্রতি ভালোবাসা এমন হতে হবে যেন কখনো মনের বিপরীত রাসুলের আদর্শের কোনো বিষয় হলেও  মানতে হবে ।

অন্যদিকে পীর দরবেশগন ও মহাক্কিক মুহাদ্দীসীনগণ বলেন; এ হাদীসে মহব্বত দ্বারা স্বভাবজাত ভালোবাসা উদ্দেশ্য ।  আমাদের শাইখ আল্লামা সাইয়্যিদ বিন নূরী  (রহ) বলেন এ হাদীসে মহব্বত দ্বারা محبت عقلي যেমন উদ্দেশ্য নয় তেমনি শুধু محبت طبعي ও উদ্দেশ্য নয় । বরং হাদীসে সেই  محبت طبعي উদ্দেশ্য যার ভিত্তি হয় محبت عقلي ।

অর্থাৎ ভালোবাসা শুরু হবে আকলি মহব্বত দ্বারাএবং উন্নতি করে করে محبت طبعيএর পর্যায়ে পৌছে যাবে।সাহাবায়ে কেরাম(রা:) এর জীবনী পাঠ করলে ইহাই প্রস্ফুটিত হয় যে তাদের ভালোবাসা ছিল طبعي বা স্বভাবজাত ।

অর্থাৎ মাতা-পিতা এবং আত্মীয় স্বজনদের ভালোবাসা থেকেও নবীজি (সা:)এর প্রতি তাদের ভালোবাসা ছিল অধিক ।

তাই হাদীসে মহব্বত দ্বারা (محبت طبعي) উদ্দেশ্য হবে যার ভিত্তি হলো (محبت عقلي)। যাতে ভালোবাসায় অপূর্ণতাও না থাকে এবং তা বিলুপ্ত ও অবসান না হয়ে যায়।

তাই রাসুলুল্লাহ (সা:) এর প্রতি উম্মতের প্রেম-প্রীতির প্রকৃত রূপ হলো খোদার নির্দেশিত পথে রাসুলের (সা:) এর আনুগত্য করা । এতে আনুগত্যের বিষয়টি কারো মনঃপূত হোক বা নাই হোক তা বিশুদ্ধ নিয়তে মেনে নিতে হবে । নতুবা রাসুলের সত্যিকারের প্রেমিক হওয়া যাবেনা ।

কুরআনে রাসুলের প্রতি উম্মতের বাস্তব ভালোবাসার প্রমাণকে তার আনুগত্যের দ্বারাই বুঝানো হয়েছে । যা সকলের জন্য অপরিহার্য ।

মহান আল্লাহ পাক আমাদের প্রতি এ নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা আল্লাহ্‌র এতায়াতের সাথে সাথে রাসুলের এতায়াত তথা আনুগত্য কর । যারা রাসুলের আনুগত্য করবে তাদের ভালোবাসা শুধু রাসুলের প্রতি নয় স্বয়ং আল্লাহর প্রতি সত্য বলে প্রকাশিত হবে ।

প্রিয় নবী(সা:) কে সবকিছু থেকে অধিক ভালোবাসতে হবে এর দ্বিতীয় কারণ (كمال বা পরিপূর্ণতা ) ।অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ(সা:) ইলম আমল ইত্যাদি সহ ছিলেন পরিপূর্ণ উত্তম চরিত্রের অধিকারী । যার কোন দৃষ্টান্ত নেই।

রাসুলুল্লাহ(সা:)এর কামালিয়ত তথা ইলম ও আমল-আখলাক সংক্রান্ত বিষয় কেমন ছিল? এর সম্পূর্ণ বিবরণ মহান রব্বে কারীম নিজেই বর্ণনা করেছেন।

ইলমের দিকে রাসুল(সা:) ছিলেন সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ । কেননা রাসুলকে উম্মাহের শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে । আল্লাহ পাক বলেন

هوالذي بعث في الأمين رسولا منهم يتلو عليهم اياته ويذكهم ويعلمهم الكتاب والحكمة وان كانوا من قبل لفي ضلال مبين. سورة جمعه-

আমি  রাসূলকে চারটি দায়িত্ব দিয়ে তোমাদের নিকট প্রেরণ করেছি ।
●তিনি কুরআন তিলাওয়াত সহীহ শুদ্ধ করে পড়াবেন।
●তিনি তোমাদের হৃদয়কে গুনাহ সমুহ থেকে পবিত্র করাবেন ।
●তিনি তোমাদেরকে কুরআনের শিক্ষা দিবেন ।
●তিনি তোমাদেরকে হিকমত শিক্ষা দিবেন ।
অর্থাৎ কীভাবে কুরআনের উপর সঠিকভাবে আমল করতে পারো তা তিনি শিক্ষা দিবেন ।
তাছাড়া রাসুলুল্লাহ(সা:) হাদীসের মধ্যে বলেছেন, আমি তোমাদের কাছে শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি । যেমন-

وعن جابر بن عبد الله ـ رضي الله عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم – قال إن الله لم يبعثن معنِّتاً ولا متعنتاً ، ولكن بعثني معلماً ميسراً ) رواه مسلم

নিশ্চয় আল্লাহ পাক আমাকে(অপরকে)কষ্টপ্রদানকারী কিংবা কষ্টে নিপতিতরূপে প্রেরণ করেননি ; বরং, তিনি আমাকে প্রেরণ করেছেন সারল্য আনয়নকারী

শিক্ষকরূপে।

নবী রাসুলগণের শিক্ষক কোন সৃষ্টিজীব নয় বরং স্বয়ং রব্বে কারীম আল্লাহ পাক হলেন তাদের শিক্ষক ।

তাই রাসুলে আরবী যেহেতু سيد المرسلين خاتم النبيين সে হিসেবে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা(সা:) এর ইলম সৃষ্টিজীবের মধ্যে অশেষ তুলনাহীন ।

রাসুলের আমল-আখলাক কিরূপ ছিল তা কুরআনের সুরা আল-কলমে বর্ণিত আছে انك لعلي خلق عظيم

নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।

● হযরত আয়েশা (রা:) বলেছেন, রাসুলের চরিত্র হলো خلقه القرآن الكريمঅর্থাৎ কুরআনে যেসকল উত্তমকাজ ও চরিত্রের শিক্ষা প্রদান করা হয়েছে তা প্রতিটি বিষয় পূর্ণাঙ্গরূপে রাসুলের কথাবার্তা  আচার আচরণে ফুটে উঠেছে । আল্লাহ পাক যেভাবে যা কিছু করতে ও না করতে বলেছেন তা সম্পূর্ণভাবে বাস্তব জীবনে রাসুল প্রয়োগ করে গেছেন ।

তাছাড়া রাসুলুল্লাহ(সা:) নিজেই বলেছেন بعثت لاتمم مكارم الأخلاق আমি সৎচরিত্রা উত্তমরূপে শিক্ষা দিতে প্রেরিত হয়েছি ।

রাসুলের কামালিয়ত যে সমস্ত নবী রাসুলদের থেকেও বেশি ছিল যার সার সংক্ষেপ কথা হলো এই যে,
بعدازخدا بزرگ توئی قصة مختصر
● খোদার পর তুমিই মহান সংক্ষেপ কথায় ।
● সুতরাং রাসুলের প্রতি ভালোবাসা সবার চেয়ে বেশী হতে হবে এটাই স্পষ্ট কথা ।

প্রিয় নবীজি(সা:)কে সবকিছু থেকে অধিক ভালবাসার তৃতীয় কারণ (قرابت তথা নিকটতা বা নৈকট্য ) ।
মানুষের সাথে মানুষের যত নৈকট্যতা গভীর হবে ততই পরস্পরের প্রেম-প্রীতি বৃদ্ধি পাবে এটাই স্বাভাবিক । নৈকট্যতার গভীরতা বন্ধুদের সম্পর্ক এমন করে দেয় যে, বন্ধু দুরে থাকলেও কাছে মনে হয়।
এ বিষয়টি একজন সত্যিকারের প্রেমিক বা প্রেমিকাই বুঝতে পারে।
বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মদ(সা:) এর নৈকট্যতা মুমিনদের মাঝে কেমন তা একটু গভীর চিন্তা দৃষ্টি দ্বারা যদি দেখা হয় তাহলে বুঝা যাবে নবীজির (সা:) নৈকট্য আমাদের মধ্যে অন্যান্যদের নৈকট্য থেকে অনেক গুণে বেশি ও অধিক শক্তিশালী ।

কেননা মানুষ মানুষের মধ্যে যে নৈকট্যতা পাওয়া যায় তা হলো শারীরিক কিন্তু প্রিয় নবীজি(সা:) এর নৈকট্য হলো রূহানী বা আত্মার সম্পর্ক । এটা স্পষ্ট কথা যে, শারীরিক থেকে আত্মার সম্পর্ক খুুব বেশি গভীর ও

উপকারী বা শক্তিশালী হয়ে থাকে ।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক এরশাদ করেন;

(النبي أولي بالمؤمنين من أنفسهم- সুরা আহযাব৬)

(মুমিনদের নিজেদের চেয়েও নবী অধিক নিকটবর্তী)
নবীজী(সা:) এর সাথে মুমিনদের সম্পর্ক নিজ স্বত্তা থেকেও অধিক । কেননা তিনি হলেন পিতৃতুল্য । হযরত উবাই (রা:) এর কিরাআতে আছে, وهو اب لهم (তিনি তাদের জন্য পিতৃতুল্য ) এসেছেন ।
এমনিভাবে আবু দাউদ শরীফে হযরত আবু হুরায়রা

(রা:) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন রাসুলুল্লাহ(সা:) বলেছেন, إنما أنا لكم بمنزلة الوالد (আমি তোমাদের জন্য পিতৃপর্যায়ের ) (সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস ৮০; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ১৪৩১)

রাসুল উম্মতের প্রতি কেমন ছিলেন আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমাদের কাছে এসেছেন তোমাদের মধ্যে থেকে এক মহা-মর্যাদাবান রাসুল ।

যিনি তোমাদের ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপথগামী হওয়ায় খুবই উদ্বিগ্ন এবং সৎকর্মের প্রতি ধাবমান হওয়ার বড়ই আশাবান । তিনি মোমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু । (সূরা তওবা : ১২৮)

উম্মতের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা ও মহাক্ষতি যার ওপর আর কোনো ক্ষতি নেই, সেটা হলো দুনিয়াতে ঈমানহারা হওয়া এবং তারই পরিণতিতে আখেরাতে স্থায়ী জাহান্নামি হওয়া । এই ধরনের ক্ষতি থেকে উম্মতকে রক্ষার জন্য প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.) বেশি চিন্তিত থাকতেন ।

আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় বন্ধুকে এমন সব গুণ আর বৈশিষ্ট্যে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করেছেন যা আর কারো মাঝে নেই । উম্মত রাসুলের দয়া, অনুগ্রহ ও ভালোবাসার এমন ঋণে আবদ্ধ যা উম্মত কখনো পরিশোধ করতে সক্ষম নয় । তিনিই তো দেখিয়েছেন উম্মতকে সরল সঠিক পথ। তিনিই পরিচয় করে দিয়েছেন বান্দাকে তার রবের সঙ্গে।  উম্মতের প্রতি তার দরদ যে কী পরিমাণ ছিল তা বর্ণনা করে শেষ করা সম্ভব নয় ।
তাই তো আল্লাহ পাক বলেন,আপনি তো মনে হয় তারা

ঈমান আনবে না- এ মর্মবেদনায় নিজের জীবনই শেষ করে ফেলবেন (সুরা শুআরা : ৩)

এজন্য কুরআন হাদীস থেকে জানা যায় প্রিয় নবীজি

(সা:) পাহাড়ের চূড়ায় উঠে কিংবা গভীর রজনীতে নির্জনে কখনো নামায রত কখনো ধ্যানমগ্ন হয়ে সবসময় উম্মতকে নিয়ে ভাবতেন কীভাবে উম্মতকে অন্যায়-অবিচার থেকে বিরত রাখা যায়।
সুতারাং উম্মতের প্রতি যখন মহব্বত ও ভালোবাসা নবীজি(সা:) এর মধ্যে সকলের চেয়ে বেশি ও পরিপূর্ণ বিদ্যমান তাই রাসুলের প্রতি উম্মতের ভালোবাসা সকলের চেয়ে এমনকি নিজের প্রাণের থেকেও অধিক হতে হবে যা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে । এটা প্রকৃত বিবেক ও বুদ্ধির দাবীও বটে ।

একবার হযরত উমর(রা:) বললেন,

لانت يا رسول الله صلى الله عليه وسلم احب الي من كل شيء إلا من نفسي

হে আল্লাহর রাসুল(সা:) আপনি অবশ্যই আমার কাছে সবকিছু থেকে প্রিয় কিন্তু আমি নিজ থেকে অধিক প্রিয় নন । তখন রাসূল(সা:) বললেন,

لا حتى أكون احب إليك من نفسك

না ‘ তুমি প্রকৃত মুমিন হতে পারবেনা হে উমর যতক্ষন না তোমার নিজ থেকেও আমি অধিক প্রিয় হই।
কিছুক্ষণ পর হযরত উমর(রা:) বললেন;

فإنك الآن احب الي من نفسي

নিশ্চয় আপনি এখন থেকে আমি নিজ থেকেও অধিক প্রিয় । রাসুল বললেন হে উমর এখন তুমি পুর্ণ মুমিন হলে।(সহীহ বুখারী ৬৬৩২)

প্রিয় নবীজি(সা:) কে সবকিছু থেকে অধিক ভালোবার চতুর্থ কারণ (نوال বা এহসান ও দয়ামায়া ) ।
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা:) এর দয়ামায়া সমগ্র সৃষ্টিজীবের প্রতি কেমন ছিল মহান আল্লাহ পাক নিজেই এরশাদ করেন । وما أرسلناك إلا رحمة للعالمين
আপনাকে সমস্ত জাহানের জন্য রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছি । রাসুল(সা:) শুধু মানুষের জন্য রহমত ছিলেন না বরং সমগ্র সৃষ্টিজীবের জন্যেও রহমত ছিলেন।

শুধু ইহকালে নয় বরং পরকালের জন্যও রাসুলুল্লাহ (সা:) কে রহমত বানিয়ে ভূপৃষ্ঠে প্রেরণ করা হয়েছে যা উপরোক্ত আয়াত থেকে প্রমাণিত । বিশ্বনবীর (সা:) দয়ামায়া ছিল যেকোন ধর্মের যেকোন মানুষের প্রতি অসাধারণ তুলনাহীন । রাসুলুল্লাহ (সা:) যেভাবে বড়দের প্রতি দয়ামায়া ও ভালোবাসা প্রকাশ করতেন তেমনি শিশুদের মনপ্রাণ দিয়ে স্নেহ করতেন । যেকোন শিশুকে তিনি নিজের সন্তানের ন্যায় আদর-সোহাগও করতেন।

আল্লাহ তাআলার অন্যতম গুণ হল ক্ষমা ও উদারতা। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামেরও বিশেষ গুণ ছিল ক্ষমা ও উদারতা ।
রাসুলের ক্ষমা ও উদারতার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে কুরআন ও হাদীসে । মক্কা বিজয়ের পর প্রিয়নবী মায়া-মমতা, ক্ষমা ও উদারতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

মক্কা ও তায়েফের কাফের সম্প্রদায় রাসুল(সা:) ও সাহাবায়ে কেরামের প্রতি যে আঘাত প্রতিঘাত করেছিল তা ইতিহাসের এক জগন্য অধ্যায় ছিল । তাদের চরম অত্যাচার নির্যাতনে রাসুলুল্লাহ (সা:) ও সাহাবায়ে কেরাম পবিত্র নগরী মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য হয়েছিলেন ।

এতকিছুর পরেও রাসুলের উদারতা ও দয়ামায়া এতটা গভীর ছিল সবকিছু ভুলে গিয়ে মক্কা বিজয়ের পর তিনি বলেছিলেন,হে কাফের সম্প্রদায় আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই ।
তাছাড়া তায়েফের দুর্ভাগা কাফের সম্প্রদায় রাসুলকে রক্তাক্ত করার পর জিব্রাইল(আ:) প্রতিশোধ নেয়ার কথা বললে রাসুল বলেছিলেন আমাকে গজবের নবী প্রেরণ করা হয়নি বরং রহমত স্বরূপ পাঠানো হয়েছে । আহ কতটাই গভীর ছিল রাসুলের উদারতা ও দয়ামায়ার দৃষ্টান্ত।

আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেন,
وكنتم على شفا حفرة من النار فانقذكم منها  (العمران ١٠٣)

তোমরা ছিলে দোযখের গর্ত কিনারায় । অতপর তিনি (সা:) তোমাদেরকে তা থেকে উদ্ধার করেন ।
আমরা ছিলাম জাহান্নামের চিরস্থায়ী অগ্নির কিনারায় সেখান থেকে আমরা যার মাধ্যমে উদ্ধার হতে পেরেছি তিনি হলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা:)।

আমাদের প্রতি রাসুলের দয়ামায়া ও স্নেহ মমতা এবং উদারতা এর চেয়ে বেশি আর কী আশা করার ছিল।তবুও রাসুলের দয়ামায়া ছিল আমাদের প্রতি অসাধারণ তুলনাহীন । যার বিস্তারিত আলোচনা কুরআন হাদীসে বিদ্যমান রয়েছে ।সুতারাং আমাদের ভালোবাসা রাসুলের প্রতি নিজের প্রাণের চেয়ে বেশি হওয়া ইনসাফের দাবি।শুধু তাই নয়, বরং নবীজির প্রতি সর্বাধিক ভালোবাসা মুমিনের ঈমান ।

নবীজির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে যদি নবীর দুশমনদের বিরুদ্ধে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতে হয় দিতে হবে । তবুও রাসুলের ইজ্জত সম্মানের অবমাননা সহ্য করা যাবে না ।

ইসলাম ও রাসূল বিদ্বেষীরা সর্বদা ইসলাম ও রাসুলের ইজ্জত সম্মান নিয়ে কটাক্ষ ও ব্যঙ্গচিত্র করে আসছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্সে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের পাহারায় বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ(সা:) এর ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শন করে সমগ্র বিশ্ব মুসলিমের হৃদয়ে আঘাত এনেছে।একজন সত্যিকারের মুমিন ও রাসূলপ্রেমিক সে কখন রাসুলের অবমাননা সহ্য করে নিতে পারে না।

এসব কুলাঙ্গারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সত্যিকারের রাসূল প্রেমিক মুমিন মুসলমানরা করতে হবে । নতুবা পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না ।

আল্লাহ পাক যেন আমাদেরকে রাসুলের সত্যিকারের প্রেমিক হিশেবে কবুল করেন ।  আমীন-

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *