পবিত্র শবে মেরাজ

ইতিহাস ইসলাম

মুহাম্মদ আবদুল হামিদ

ইসলামের ইতিহাসে রাসূল (সা.) এর মি’রাজ অত্যন্ত গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূণ। পূথিবীর ইতিহাসে যেসব যুগান্তকারী ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, তন্মধ্যে শবে মি’রাজের স্থান সর্ব শীর্ষে। মহানবী (সা.) যখন জাগতিক ও পারিপার্শিক অসহায় অবস্থার সম্মুখীন হন, পিতৃব্য আবু তালিব ও বিবি খাদিজা (রা.) এর আকস্মিক ইন্তেকাল হয়, অন্যদিকে কাফেরদের অত্যাচার তাঁকে বিপর্যস্ত করে তোলে; তখন মিরাজের মাধ্যমে আল্লাহ তা’লা স্বীয় হাবীবকে নিজের সান্নিধ্যে নিয়ে সান্তনা দেন। সম্মান প্রদর্শন করেন। এমন তিনটি মর্যাদায় ভুষিত করেন যা পূর্বে কেউ পান নি, আর কেউ পাবেনও না। তিনটি উপাধি হচ্ছে এই- ‘সাইয়্যিদুল মুরসালীন’- সকল রাসূলের সরদার, ‘ইমামুল মুত্তাকীন’- সকল মুত্তাকীদের প্রতিনিধি, ‘রাহমাতুল্লিল আলামীন’- সর্ববিশ্বের করুণা। আল্লাহ তা’লা হুজুর (সা.) কে এভাবেই সম্মান প্রদর্শন করেন, শ্রেষ্টত্ব দান করেন এবং আদর্শ সমাজ সংস্কারের দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। মুসলিম সংস্কৃতিতে প্রতিবছর মি’রাজ রজনী খুবই ভাবগাম্ভীর্যের সহিত পালিত হয়।
‘মিরাজ’ তথা আল্লাহর কুদরতি বাহনে উর্ধ্বলোকে আরাহণ, সপ্তাকাশ পরিভ্রমণ, সৃষ্টিজগতের রহস্য অবলোকন, জান্নাত জাহান্নাম পরিদর্শন ও আল্লাহর দরবারে মহামিলন, কথোপকথন রাসূলুল্লাহ (সা.) এর জীবনের শ্রেষ্ঠ মু’জিযা । অন্য কোন নবীকে এই মু’জিযা প্রদান করা হয় নাই। মহান আল্লাহ তালা বলেন: “পবিত্র ও মহিমাময় তিনি যিনি তাহার বান্দাকে রজনীযোগে ভ্রমণ করাইয়াছিলেন আল-মাসজিদুল হারাম হইতে আল-মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যাহার পরিবেশ আমি করিয়াছিলাম বরকতময়, তাহাকে আমার নিদর্শন দেখাইবার জন্য; তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” (আল কোরআন, সূরা-বনী ইসরাঈল-১)
মহান আল্লাহ তা’লা তাঁর প্রিয় হাবীবকে যত মুজিযা দান করেছেন সেগুলির অন্যতম বিস্ময়কর মু’জেযা হলো ইসরা ও মি’রাজ। এজন্যই মি’রাজের আয়াতের শুরুতেই আল্লাহ পাক ‘সুবহানাল্লাহ’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন, যা কেবল আশ্চর্য্যজনক ঘটনার ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ‘ইসরা’ অর্থ : নৈশ-ভ্রমণ বা রাত্রিকালে ভ্রমণ। আর মি’রাজ অর্থ : ঊর্ধ্বারোহণ বা উর্ধ্বারোহণের বাহন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা রাসূলুল্লাহ (সা.) কে এক রাত্রিতে বা রাত্রীর কিছু অংশে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত এরপর সেখান থেকে সাত আসমান, সিদরাতুল মুনতাহা, জান্নাত ও জাহান্নাম এবং উর্ধ্ব জগতের অন্যান্য বড় বড় নিদর্শন দর্শনের উদ্দেশ্যে জাগ্রত অবস্থায় স্বশরীরে রাত্রীবেলা ভ্রমণ করান। মাসজিদে হারাম (মক্কা শরীফ) থেকে আল-মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণকে ‘ইসরা’ এবং সেখান থেকে ঊর্ধ্বে গমনকে মি’রাজ বলা হয়।
নবী করীম (সা.) এর ৫০ বছর বয়সে মাক্কি জীবনের শেষলগ্নে নবুওতের দশম বছরে রজব মাসের ২৭ তারিখ রাত্রীতে মিরাজের মহিমান্বিত ও বিস্ময়কর ঘটনা সংঘটিত হয়। আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতাগণ ‘বোরাক’ (দ্রুতগতি সম্পন্ন বৈদ্যুতিক বাহন) এর মাধ্যমে নিয়ে যান মাসজিদে হারাম থেকে মাসজিদে আকসা পর্যন্ত। তারপর উর্ধ্বলোকে পরিভ্রমণে মহানবী (সা.) বিশ্বস্রষ্টার নভোমন্ডলের অপরূপ দৃশ্যাবলি দেখে তিনি বিমোহিত হন। সপ্তাকাশে ফেরেশতারা তাকে অভ্যর্থণা জানান এবং নবীগণের সাথে সাক্ষাত করেন। জান্নাত-জাহান্নাম পরিদর্শন করেন। তিনি আল্লাহর বিধি-বিধান, ভাগ্যলিপি অবিরাম লিখে চলতেছে যে কলম সেটাকেও লিখনরত দেখতে পান। সিদরাতুল মুনতাহা দেখেন। সেখানে আল্লাহ তা’লার নির্দেশে স্বর্ণের প্রজাপতি এবং বিভিন্ন রঙের প্রজাপতি ইতস্ততঃ ছোটাছুটি করছিল। ফেরেশতারা স্থানটিকে ঘিরে রেখেছিলেন। সেখানে রাসূল (সা,) জিবরাইল (আ.) কে স্বরূপে দেখতে পান। তাঁর ছয় শত পাখা ছিল। সেখান থেকেই একটি দিগন্তবেষ্টিত সবুজ রঙের কুদরতি বাহন ‘রফরফে’ (সবুজ রঙের গদিবিশিষ্ট পাল্কীকে রফরফ বলা হয়) আরোহণ করে কল্পনাতীত দ্রুতবেগে ৭০ হাজার নূরের পর্দা পেরিয়ে আরশে মোয়াল্লার সন্নিকটে এবং আল্লাহর দরবারে হাজির হন। সেখানে আল্লাহ তা’লার সঙ্গে সাক্ষাত ও কথোপকথন হয়। আল্লাহ নিজে তাঁকে সালাম বলে অভিবাদন জানান এবং তুহফা (আত্তাহিয়্যাতু) প্রদান করে সম্মানিত করেন। আল্লাহ তা’লা রাসূল (সা.) কে খলীল ও হাবীবরূপে গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর নৈকট্য, সান্নিধ্য ও দিদার লাভ করার পর জ্ঞান গরিমায় মহিয়ান হয়ে তার প্রশংসা ও গুণকীর্তন করেন। করুণা ও শুভেচ্ছার নিদর্শনস্বরুপ মিরাজ রজনীর উপহার হিসেবে আল্লাহর বান্দাদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের হুকুম নিয়ে ওই রাতেই গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হওয়ার নির্দেশ হয়। পরে তা হ্রাস করে পাঁচ ওয়াক্ত করে দেওয়া হয়। এবং এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজই পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজের সওয়াবের সমপরিমাণ করে দেওয়া হয়। এর দ্বারা সকল ইবাদতের মধ্যে নামাজের বিশেষ গুরুত্ব ও শ্রেষ্টত্ব প্রমাণিত হয়। (তাফসীরে মা’রিফুল কুরআন)
আল কুরআনের সূরায়ে নাজ্ম এর প্রথম দিকের আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা’লা মিরাজের বর্ণনা সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। রাসূল (সা.) আল্লাহর নিদর্শন দর্শনের বিবরণ দিতে গিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা’লা বলেন: “সিদরাতুল মুনতাহার (ফেরেশতদের গমণাগমণের শেষ সীমায় বদরিকা বৃক্ষের) কাছে, যার কাছে রয়েছে মু’মিনদের বসবাসের ঠিকানা জান্নাত; সে সেদরাটি (বদরিকা বৃক্ষ, এই বৃক্ষের মূল শিকড় ষষ্ঠ আকাশে এবং শাখা-প্রশাখা সপ্তম আকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত) তখন যেরকম জ্যোতি দ্বারা আচ্ছন্ন হওয়ার সেরকম আচ্ছন্ন ছিলো, এখানে তাঁর (রাসূল সা.) কোন রকম দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি এবং তার দৃষ্টিও সীমা লংঘন করে নি। অবশ্যই সে তার মালিকের বড় বড় নিদর্শনসমুহ দর্শন করেছে।” (সুরা নাজম- ১৪ থেকে ১৮)
মি’রাজের অন্যতম উপহার হলো পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামাজ। মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীবকে নিজের সান্নিধ্যে নিয়ে তাকে তার উম্মাতের জন্য নামাজের মহান নিয়ামত প্রদান করেছেন। নামাজের মাধ্যমেই উম্মাত দুনিয়া ও আখিরাতের সর্বোচ্চ নিয়ামত লাভ করতে পারবে। নামাজকে গ্রহণ করলে মি’রাজের উপহার গ্রহণ করা হয়। মু’মিনের মি’রাজ হচ্ছে নামাজ। মুসলিম সংস্কৃতিতে প্রতিবছর এরজনী খুবই ভাবগাম্ভীর্যের সহিত পালিত হয়।
এবার এমন এক সময়ে এ রজনী আমাদের মাঝে এসেছে যখন মরণঘাতক করোনাভাইরাসের ছোবলে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। গোটা বিশ্বমৃত্যুপুরীতে পরিণত হতে যাচ্ছে। সর্বত্রই অচলাবস্থা। মানুষের নাফরমানীর করণেই এসব বিপর্যয় পৃথিবীতে আসে। সুরাং আসুন! পবিত্র এ রজনীতে বেশী বেশী ইস্তেগফার করি, নিজেদের গোনাহ মাফির জন্য আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করি। ইয়া আল্লাহ! আমাদেরকে ক্ষমা করুন, সকল প্রকার আযাব ও গজব থেকে হেফাযত করুন, বিশ্বমহামারী করোনাভারাসের ছোবল থেকে বিশ্ববাসীকে হেফাযত করুন। আমীন।

লেখক: প্রবন্ধকার ও কলাম লেখক।
শিক্ষক : জামেয়া আনওয়ারে মদিনা, পশ্চিম ভাটপাড়া, ইসলামপুর সিলেট।