“মাওলানা”উপাধি’র মর্ম, ওদের গাত্রদাহের কারণ

কলাম

শাহ মমশাদ আহমদ: ভারত,পাকিস্তান ও বাংলাদেশের আলেমদের বহুকাল থেকে মাওলানা বলা হয়৷ আরব দেশে আলেমদের শায়েখ বলা হয়ে থাকে।

মাওলানা আলেমদের উপাধি৷ বিশ্বের স্বীকৃত কোন আলেম এব্যাপারে অভিযোগ না করলেও ইদানীং কিছু সালাফী নামধারী ভাইদের মুসলমানদের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা করতে দেখা যায়।

আরবী ভাষায় যে ব্যক্তি সামান্যতমজ্ঞান রাখে সেও এবিষয়ে তাদের কথা শুনে লজ্জা পাবে। চটি বই পড়ে যারা নিজেদের ইসলামী পন্ডিত ভাবেন, তারাই আলেমদের প্রতি বিদ্বেষ লালন করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন।

পবিত্র কুরআনের সুরা বাকারার শেষ আয়াতে انت مولانا (আনতা মাওলানা) দ্বারা আল্লাহই উদ্দেশ্য, এতে সন্দেহ নেই৷ তবে মাওলা শব্দ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ক্ষেত্রে বলা যাবেনা, এমন কথা কুরআন সুন্নাহ বিরুধী, অনেক মুসলমানদের যেহেতু এ আয়াত মুখস্ত, এ সুযোগে ওরা মাওলানা শব্দের ব্যাপারে ঠুনকো যুক্তি বলে বেড়াবার দুঃসাহস দেখাচ্ছে।

মুলতঃ ‘মাওলানা’ দুটি শব্দের সমষ্টি, মাওলা এবং না৷ দ্বিতীয় অংশ সর্বনাম, অর্থ আমাদের৷ প্রথম অংশ মাওলা৷ এ শব্দের আরবী অভিধানে পঞ্চাশের অধিক অর্থ রয়েছে৷ প্রচলিত কয়েকটি অর্থের মধ্যে রয়েছে, প্রভু, মালিক, প্রতিপালক, পালনকর্তা, লালন কারী, বন্ধু, গোলাম আযাদকারী, আযাদকৃত গোলাম, দয়ালু, নেতা, অনুসরনীয় ইত্যাদি।

প্রকৃত অর্থে আল্লাহই মাওলা বা প্রতিপালক৷ অন্যদেরও মাওলা ভিন্ন অর্থে বলা যায়৷ যেমন, আমরা সম্পদের মালিক বলে থাকি৷ অথচ প্রকৃত মালিক তো মহান আল্লাহ।

আমরা যখন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কে মাওলানা বলি, তখন প্রকৃত অর্থ আমাদের মাওলা, প্রতিপালক উদ্দেশ্য হয়৷

যখন আমাদের বন্ধুকে আনতা মাওলানা বলি, তখন তুমি আমাদের বন্ধু উদ্দেশ্য হয়৷ যখন একজন আলেমকে মাওলানা বলা হয় এর দ্বারা উদ্দেশ্য হয় আমাদের অনুসরনীয় ব্যক্তি।

কুরআন কারিমে আল্লাহ পাক মাওলা শব্দ বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার করেছেন।

– فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ مَوْلَاهُ وَجِبْرِيلُ وَصَالِحُ الْمُؤْمِنِينَ

আল্লাহ ও জিবরাইল এবং নেক মুমিনগণ রাসুলুল্লাহ এর বন্ধু। (সূরা তাহরীম)

একই আয়াতে আল্লাহ, জিবরাইল ও মুমিনদের মাওলা বলেছেন৷ যদি আল্লাহ ছাড়া কাউকে মাওলা বলা অবৈধ হয়, তাহলে আল্লাহ কিভাবে জিবরাইল ও মুমিনদেরকে মাওলা বললেন?

– يَوْمَ لَا يُغْنِي مَوْلًى عَن مَّوْلًى شَيْئًا وَلَا هُمْ يُنصَرُونَ

‘যে দিন কোন বন্ধু বন্ধুর কাজে আসবেনা, এবং তাদের সাহায্য করা হবেনা’। (সূরা দুখান)

আল্লাহ সাধারণ বন্ধু অর্থে মাওলা প্রয়োগ করেছেন।

৩-

فَٱلْيَوْمَ لَا يُؤْخَذُ مِنكُمْ فِدْيَةٌ وَلَا مِنَ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ ۚ مَأْوَىٰكُمُ ٱلنَّارُ ۖ هِىَ مَوْلَىٰكُمْ وَبِئْسَ ٱلْمَصِير

‘আজ তোমাদের কাছ থেকে ও কাফেরদের কাছ থেকে কোনো মুক্তিপন গ্রহণ করা হবেনা, তোমাদের উভয়ের ঠিকানা হবে জাহান্নামের আগুন। আর তাই হবে তোমাদের সাথী, কত নিকৃষ্ট তোমাদের এ পরিমাণ!’ (সূরা হাদীদ)

প্রিয় নবী সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও আল্লাহ ছাড়া অন্যদের ক্ষেত্রে মাওলা ব্যবহার করেছেন৷ যেমন,

– প্রখ্যাত সাহাবী হযরত জায়েদ বিন হারেসা রাঃ কে প্রিয় নবী সঃ বলেন

أَنْتَ أَخُونَا وَمَوْلَانَا (بخارى)

তুমি আমাদের ভাইও আমাদের মাওলা। (সহীহ বুখারী)

-হযরত আলী রাজিঃ এর ব্যাপারে নবীজি বলেন,

مَنْ كُنْتُ مَوْلَاهُ فَعَلِيٌّ مَوْلَاهُ

যে আমার বন্ধু আলী ও তার বন্ধু, (ইবনু মাজাহ)

প্রিয় নবী মাওলা বন্ধু অর্থে বলেছেন।

– রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাস দাসীদের নিজ মালিককে আমার রব না বলে আমার মাওলা বলার নির্দেশ দিয়েছেন,( বুখারী মুসলিম)।

এছাড়া আমাদের আসলাফদের মধ্যে ও বিজ্ঞ আলেমের উপাধি হিসাবে মাওলানা শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায়৷

১-হযরত আনাস বিন মালেক রাজিঃ কে একটি বিষয়ে ফতোয়া জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন,

أسأل مولانا الحسن (مصنف ابن ابى شيبه)

আমাদের মাওলানা হাসান কে জিজ্ঞাসা কর।

-ইমাম বুখারী রহ كريب নামক রাবির পরিচয় দিয়েছেনمولى ابن عباسবলে।

-نافع এর পরিচয় দিয়েছেন مولى ابن عمر বলে।

৪-উসুলে হাদীস, উসুলে ফেকাহ ও ফেকাহের কিতাবে অসংখ্য ব্যক্তিদের পরিচয় মাওলা বলে দেয়া হয়েছে।

একই শব্দ স্থান কাল পাত্র ভেদে ভিন্ন অর্থে ব্যবহার হওয়া স্বতসিদ্ধ ব্যাপার৷ আরবী ভাষায় এর শৈলিতা বুঝতে হলে ঈলমে বালাগাত (অলংকার শাস্ত্র) জানতে হয়৷ নিজে নিজে কুরআন হাদীস তরজমা শিখে তা অনুধাবন করা যায়না৷

যেমন اعظم শব্দের অর্থ সবচেয়ে মহান৷ আর اكبر শব্দের অর্থ সবচেয়ে বড়৷ প্রকৃত অর্থে আজাম ও আকবার একমাত্র আল্লাহ৷ আপেক্ষিকভাবে অন্যের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যায়।

পরিশেষে বলবো, আলেমদের মাওলানা উপাধি প্রদান করে, তাদের দায়িত্ব ও সমাজের করনীয় নির্ধারণ করা হয়েছে।

-মাওলানা মানে আমাদের অনুসরনীয়, কুরআন সুন্নাহের গভীর জ্ঞান অর্জন ও আমল করে আলেমদের অনুসরনীয় হতে হবে৷ এরূপ আলেমদের সমাজের মানুষকে অনুসরণ করতে হবে।

২-মাওলানা মানে আমাদের বন্ধু৷ আলেমদের বন্ধুর মত মিষ্টি ভাষায় দাওয়াতি কাজ করতে হবে৷ সমাজকেও বন্ধুর মত আলেমকে মুহাব্বাত করতে হবে।

– মাওলানা এর আরেক অর্থ আমাদের নেতা৷ একজন আলেমকে সাধারণ মানুষদের ইহ-পরকালীন শান্তির কাজে নেতৃত্ব দিতে হয়৷ মুসলমানদের ও সর্বক্ষেত্রে আলেমদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার থাকতে হবে।

মাওলানা নিছক একটি শব্দ নয়, একটি নির্দেশনা, একটি চেতনা, একটি দায়িত্ববাহী উপাধি৷ তাই মাওলানা শব্দে উলামা বিদ্বেষী চক্রের এত গাত্রদাহ।

আল্লাহ আমাদের বিষয়টি বুঝার তাওফিক দিন।

মুহাদ্দিস, জামেয়া মাদানিয়া ইসলামিয়া কাজির বাজার, সিলেট