রামাযানের শেষ দশকে করণীয় আমল

নিবন্ধ
  • মুফতী সালাতুর রহমান মাহবুব 

অফুরন্ত নেয়ামতের মাস রামাযানের প্রায় দু-তৃতীয়াংশ শেষের পথে। বাকি এক তৃতীয়াংশ দেখতে দেখতে শেষ হয়ে যাবে,আমরা টেরই পাব না। পরে শুধু আফসোসই করতে থাকব, হায়রে তেমন কিছুই তো করা হলো না! প্রত্যেকের কাছে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট রামাযানের শেষ দশ দিন অতীব গুরুত্ববহ ও ফযীলতের সময়। তাই আসুন সামনের দিনগুলোতে বিশেষ করে শেষ দশ দিনকে সামনে রেখে আমরা বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহন করি। নিম্নোক্ত বিশেষ তিনটি কারণে শেষ দশদিনের মাহাত্ম্য ফুটে উঠে।

প্রথমত, এ দিনগুলোতে সাইয়্যেদুল মুরসালিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবাদতের পরিমাণ অনেক গুণ বাড়িয়ে দিতেন শেষ দশকে।হযরত আয়েশা রা: বর্ণনা করেন,সাইয়্যেদুল মুরসালিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ দশ দিনে ইবাদতের জন্য এত বেশী চেষ্টা করতেন,যা তিনি অন্য সময়ে করতেন না।
(বুখারী শরীফ)

তিনি আরেকটি হাদীসে বলেছেন,শেষ দশদিন এসে গেলে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাত জেগে ইবাদতে লেগে যেতেন।
পরিবারের অন্যদেরকে জাগিয়ে দিতেন।কঠিন প্রচেষ্টা চালাতেন।কোমরে কাপড় বেঁধে নিতেন।
কাজেই যতদূর পারা যায়, দুনিয়াবী তৎপরতা কমিয়ে দিয়ে এ দশদিনে ইবাদতে মনোনিবেশ করা কর্তব্য। তাহাজ্জুদ যেন একদিনও ছুটে না যায়,সে চেষ্টা করা প্রত্যেক মুমিনের উচিত।রাব্বে কারীমের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন , কোরআন তিলাওয়াত,যিকির ইস্তেগফার ও দোয়া দুরুদের আমল বেশী বেশী করে করার চেষ্টা করতে হবে ।

দ্বিতীয়ত, এ দশদিনে লুকিয়ে রয়েছে একটি বিশেষ রাত- লাইলাতুল ক্বদর। যে রাতটি হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।অর্থাৎ এক হাজার মাসব্যাপী কেউ ইবাদত করলে, যে সওয়াব অর্জন করবে,এই একটি মাত্র রাত্রে সঠিকভাবে ইবাদত করতে পারলে তারচেয়েও বেশি নেকি ও কল্যাণের অধিকারী হয়ে যাবে। সাই্যদুল মুরসালিন সা: বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের নিয়তে কদরের রাত জেগে ইবাদত করবে, তার অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। (সহীহ বুখারি-৩৪)
এ হাদীসে ঈমান এবং ইহতেসাব বলতে বুঝানো হয়েছে লাইলাতুল ক্বদরের যে মর্যাদা ও ফযিলত আল্লাহ এবং সাই্যদুল মুরসালিন সা: এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা এবং আমল করতে পারলে যে সওয়াব পাওয়া যাবে,তার জন্য ব্যাকুল হওয়া।

ক্বদরের রাত কোনটি? এ প্রসঙ্গে সাই্যদুল মুরসালিন সা: ইরশাদ করেছেন, রামাযানের শেষ দশকে লাইলাতুল ক্বদর অন্বেষণ করো।(বুখারী শরীফ) অন্য হাদীসে আরো ব্যাখ্যা করে বলেছেন, শেষ দশদিনের বেজোড় রাতসমূহে লাইলাতুল ক্বদর অন্বেষণ করো।(বুখারী শরীফ)

উপরোল্লিখিত হাদীস সমূহের আলোকে ওলামাদের মতামত হলো লাইলাতুল ক্বদরের ইবাদত শুধু এক রাতে না করে ২১,২৩,২৫,২৭ এবং ২৯ এ সবগুলো রমজানের রাতে করতে হবে।

আর সাই্যদুল মুরসালিন সা: কে নির্দিষ্ট রাতটি ভুলিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে আল্লাহ আমাদেরকে এক রাতের পরিবর্তে পাঁচটি রাতে সবিশেষ গুরুত্ব সহকারে ইবাদত করার ব্যবস্থা করে দিলেন।
এ রাতের ইবাদত সমূহের অন্যতম কয়েকটি হলো : নামায,তিলাওয়াত,যিকির,দান খয়রাত, দোয়া-ইস্তিগফার।

হযরত আয়েশা রা: থেকে রেওয়াত আছে, তিনি একদিন সাই্যদুল মুরসালিন সা: কে প্রশ্ন করেছিলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ!আমি লাইলাতুল ক্বদর পেয়ে গেলে কোন দোয়াটি বেশি বেশি করে আমল করব? তিনি বললেন اللهم انك عفو تحب العفوا فعف عني. অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি অনেক বেশী ক্ষমাকারী।ক্ষমা করা পছন্দ করেন।আমাকে ক্ষমা করে দিন।

তৃতীয়ত, রামাযানের শেষ দশদিনে রয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ আমাল।আর তা হচ্ছে ই’তিকাফ।
সাই্যদুল মুরসালিন সা: জীবনের শেষ বৎসর পর্যন্ত রমজানের শেষ দশদিনের ইতিকাফ করে গেছেন। শেষ দশদিনের সময়কে পুরোপুরিভাবে ইবাদতে কাজে লাগাতে ই’তিকাফ একটি বিরাট সুযোগ। তাই আসুন, আমরা পরিকল্পনা গ্রহন করি,কিভাবে রামাযানের বাকি দিনগুলোর সদ্ব্যবহার করে আমাদের নেকির পরিমাণ বাড়িয়ে নিতে পারি।আল্লাহপাক আমাদেরকে তাওফীক দান করুন। আমীন।
লেখক: ইমাম ফোর্ড স্কয়ার মসজিদ ও পরিচালক আল উবায়েদ একাডেমী লন্ডন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *