লকডাউনে ছাত্রনেতাদের সময় কাটছে যেভাবে

ফিচার সংগঠন

ভয়েস টাইমস: বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাসের কবলে সারাবিশ্ব লকডাউনে। প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। দেশের মানুষ আতংকিত। শংকিত। হতদরিদ্র মানুষরা ক্ষুধার্ত। মহামারীর অর্থনৈতিক ক্ষতির কবল থেকে বাদ যায়নি মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীও। প্রয়োজন অভাবীর পাশে দাঁড়ানোর। জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা তৈরির।

জাতির আগামী দিনের কাণ্ডারী, দেশের ইসলামী ছাত্র সংগঠনের ছাত্রনেতাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে চলমান সার্বিক বিষয়ে।
লকডাউনে কী করছেন তাঁরা? কীভাবে কাটছে তাঁদের সময়? মহামারীর জনসচেতনতা তৈরীতে কীভাবে কাজ করছেন তারা, এবং তাদের সংগঠন? নিজ দলের দরিদ্র এবং অসচ্ছল কর্মীদের ব্যাপারে দলীয়ভাবে কি কি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে?

এমনই কিছু প্রশ্ন নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় ৩ জন ছাত্রনেতার সাথে কথা বলেছেন ভয়েস টাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমের বিশেষ প্রতিবেদক মনসুর আহমদ।

প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিসের কেন্দ্রীয় সভাপতি তারিক বিন হাবীব বলেন, যেহেতু সারাদেশে লকডাউন চলছে, সরকারের পক্ষ থেকে সবার প্রতি প্রয়োজন ছাড়া বাড়িতে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, সেহেতু লকডাউনের সিংহভাগ সময় বাড়িতে অবস্থান করে জ্ঞানচর্চা, অজানাকে জানা, এবং ইসলামের গৌরবময় ইতিহাস ঐতিহ্য জানতে বইয়ের প্রতি মনোনিবেশ করেছি।
যথাসাধ্য আম্মার সেবা যত্ন করার চেষ্টা করছি। যতটুকু সম্ভব আম্মা এবং পরিবারের সাথে সময় কাটানোর চেষ্টা করছি। সাংগঠনিক কাজের ব্যস্ততায় পরিবারের সাথে সময় কাটানোর সুযোগ হতো খুব কম। লকডাউনের সুবাদে ব্যস্ততা আগের মত নাই, তাই পরিবারের সাথে সময় কাটাতে পারছি।
এছাড়াও সাবেক আমীরে মজলিস প্রিন্সিপাল আল্লামা হাবীবুর রহমান (রহঃ)’র প্রতিষ্ঠিত সেবামূলক সংগঠন “আল-মারকাজুল খায়রী আল-ইসলামী” এবং সিলেটের বৃহৎ সেবামূলক সংগঠন “Save Sylhet” এর সাথে যুক্ত হয়ে অসহায় এবং দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। আলহামদুলিল্লাহ! এভাবেই দিনগুলো অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ খুবই সহজ সরল। বৈশ্বিক এই মহামারী সম্পর্কে সবাই খুব বেশি অবগত নন। অনেকের মনেই মহামারী নিয়ে আছে বিভিন্ন শংকা। সেই সাথে আছে বিভিন্ন গুজব।
আবার অধিকাংশ মানুষেরই Covid 19 নিয়ে স্বচ্ছ ধারণা নাই। তাই বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিসের পক্ষ থেকে অনলাইন এবং অফলাইন উভয় মাধ্যমে জনসচেতনতা তৈরির কাজ করা হচ্ছে।
অনলাইনের জনপ্রিয় যোগাযোগ মাধ্যম হলো ফেইসবুক। অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যম থেকে ফেইসবুকে মানুষ সময় দেয় বেশি। তাই আমরা অনলাইনে সচেতনতা তৈরির জন্য ফেইসবুককে মাধ্যম বানিয়ে কাজ শুরু করেছি। দলীয় নেতাকর্মীদের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডির পাশাপাশি, বিভিন্ন গ্রুপ এবং পেইজে লেখালেখির মাধ্যমে জনসচেতনতা তৈরির কাজ করছি। এছাড়াও বিভিন্ন অনলাইন নিউজের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করছি।
আমাদের প্রত্যেক শাখায় সদস্য এবং কর্মীদের মাধ্যমে নিজ নিজ এলাকায়, বিশেষ করে গ্রামে, গঞ্জে, পাড়ায়, মহল্লায় এবং যত জায়গায় আমাদের শাখা রয়েছে প্রত্যেক জায়গায় আমরা জনসচেতনতা তৈরির কাজ করছি।
করোনা মহামারী থেকে দেশ, জাতি সর্বোপরি মুসলিম উম্মাহর পরিত্রাণের জন্য বিভিন্ন শাখায় কুরআন খতম ও দোয়া করা হয়েছে।

তিনি বলেন,বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিস প্রতিটি শাখার দরিদ্র এবং অসচ্ছল কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছে। প্রত্যেকের কাছে নগদ অর্থ এবং ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছে।
লকডাউন কতদিন থাকবে তার কোন নিশ্চয়তা নাই। তাই রমজান এবং ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দরিদ্র এবং অসচ্ছল কর্মীদের ব্যাপারে কিছু করার চিন্তা ভাবনা করছি।

এবিষয়ে ছাত্র জমিয়তের কেন্দ্রীয় সভাপতি তোফায়েল গাজালী বলেন, আমি রাজনীতি করি। পেশাদার রাজনীতিক আমি। আমি নেশার মতো বইও পড়ি। টুকটাক লেখালেখি করি। বলা যায় লকডাউন এর পুরোটা সময়ই আমার কাটছে লেখা পড়ায়। দীর্ঘদিন পর প্রচুর সময় হাতে পাওয়ায় আমি আকাবির ওলামাদের জীবন চরিত পড়ছি খুব বেশি। বিশেষত শায়খুল ইসলাম হোসাইন আহমদ মাদানী ও হজরতজী ইলিয়াস রহ.কে নিয়ে দুটি গ্রন্থের কাজ মোটামুটিভাবে শেষের পথে।
ঘরে বসে সারা দেশের নেতাকর্মীদের খোঁজ খবর নেই। আত্মীয় স্বজনদের সময় দেই। এভাবেই সময় পার হয়ে যাচ্ছে।

জনসচেতনতামূলক কোন কাজ করছেন কী না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মহামারিতে জনসচেতনতার জন্য অনলাইন বেজড প্রচুর কাজ আমরা করেছি। প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ার মাধ্যমেও সচেতনতার সংবাদ আমরা পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি।

অর্থিক সংকটে পড়া কর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরিপূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষা করে শুধু দলীয় কর্মী নয় বরং অসচ্ছল ও অভাবী মানুষকে আমরা আমাদের সাধ্য মতো সহযোগিতা করেছি।

এসব প্রশ্নের উত্তরে ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের সেক্রেটারি জেনারেল নুরুল করীম আকরাম বলেন, এই মূহুর্তে ভয়েস টাইমস যারা পড়ছেন, সে সকল সম্মানিত পাঠকগণসহ বিশ্ববাসীকে পবিত্র মাহে রমজানের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। করোনায় আক্রান্তদের জন্য সমবেদনা ও দোআ। পাশাপাশি বিশেষ এ আয়োজনটির জন্য ভয়েস টাইমস পরিবারকেও জানাচ্ছি অসংখ্য মোবারকবাদ।

সময় কীভাবে কাটছে? -এর উত্তরে তিনি বলেন,লকডাউনের সময়গুলো বইপাঠ, বিষয়ভিত্তিক লেখালেখি এবং সংগঠনের অনলাইনভিত্তিক যোগাযোগ ও পারিবারিক কাজেই ব্যয় হচ্ছে, আলহামদুলিল্লাহ।
আমরা যারা ছাত্র, আমাদের জন্য লকডাউন এক ধরণের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। কারণ, আমরা সাধারণতঃ প্রতিষ্ঠানের রুটিনমাফিক ক্লাসের পড়াশোনার বাইরের আউট অব সিলেবাস বা গায়রে দরসী বই পড়াশোনার সুযোগ হয়না অনেকেরই। এতে করে জীবন ও জগতের যে বিশাল পরিসর বিভিন্ন বইতে রয়েছে, তা আর জানাও হয়না। এজন্য বন্ধের সময়গুলো বইপাঠের জন্য খুবই কার্যকরি। এছাড়া যারা সময়ের অভাবে লেখতে পারেন না, বা লেখালেখিটা ধরতে পারেন না, অবসরের এ সময়টি তাদের জন্যও সমান গুরুত্বের।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আমরা যারা পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্র সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত থাকি, অনেক সময় পরিবারের সাথে টাইম এসপেন্ড করা বা নিকটাত্মীয়দের সময় দেয়া খুব একটা হয়ে ওঠেনা। লকডাউনের সময়টিতে এ কাজটিও হচ্ছে।

সংগঠনের কর্মতৎপরতা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন’ই প্রথম সংগঠন, যারা করোনা (COVID-19) বিপর্যয়ে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ঘোষণা দিয়ে নিয়মতান্ত্রিক সকল সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত করে দেশব্যাপী সচেতনতা ও মানবিক কার্যক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
গত জানুয়ারি (২০২০) মাসে যখন চীন থেকে বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া যায়, (এশিয়ার কোন দেশে তখনো ছড়ায়নি) তখনই সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে লিফলেট প্রচার করেছে ইশা ছাত্র আন্দোলন।

তারপর গত ০৮ মার্চ ২০২০ইং তারিখ বাংলাদেশে করোনা সনাক্ত হওয়ার পর ১৯ মার্চ ২০২০ইং তারিখ কেন্দ্রীয় কমিটির জরুরি মিটিং-এর সিদ্ধান্তানুযায়ী সংগঠনের সভাপতি ও সেক্রেটারি জেনারেল সাক্ষরিত এক জরুরি নির্দেশনায় নিয়মিত দৃশ্যমান সকল সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করে করোনা ভাইরাস সৃষ্ট বিপর্যয়ে দেশব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছি আমরা।

সে অনুযায়ী গত ২০ মার্চ থেকে সারাদেশে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে সচেতনতামূলক লিফলেট, মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও মাসজিদভিত্তিক হ্যান্ড ওয়াস ও সাবান বিতরণ করেছি আমরা। সর্বস্তরের জনশক্তিকে নিয়ে একাধিকবার রোজা পালন করেছি বিপদ থেকে মুক্তির জন্য এবং খতমে শিফা পড়েছি সারা দেশে। তারপর মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে অভাবী আলেম পরিবার, কর্মচ্যুত ব্যক্তি, উপার্জন অক্ষম মানুষ, অসুস্থ, দিনমজুর, বেকার যুবক, অসহায় বিধবা, উপজাতি, অমুসলিম ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠির মাঝে আমরা নগদ অর্থ ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কর্মসূচি পালন করেছি জেলা-মহানগর, থানা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শাখার দায়িত্বশীলদের মাধ্যমে।

তারপর যখন রমজান অত্যাসন্ন, তখন জরুরি নির্দেশনার মাধ্যমে অভাবি পরিবারগুলোর মাঝে ইউনিয়ন-ওয়ার্ডভিত্তিক ইফতার ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেছি আমরা। যা এখনো চলমান আলহামদুলিল্লাহ।

পাশাপাশি পাঠক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখে থাকবেন, দেশব্যাপী লকডাউনে সারাদেশের ধানচাষী কৃষকরা যখন শ্রমিকের অভাবে হতাশায় ভুগছিলো, অপরদিকে একশ্রেণির সরকারি আমলারা কৃষকের সাথে উপহাস করছিলো, তখন আমরা আমাদের জনশক্তিকে নিয়ে কৃষকের পাকা ধান কেটে বাড়ি পৌঁছে দিতে কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। এই রমজানেও এটি চলমান রয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ।

শুধু ধানকাটা নয়; আমরা করোনা বিপর্যয়ের শুরুতেই বীজ বিতরণ কর্মসূচি ঘোষণা করেছি। যার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই জাতীয় পর্যায়ে অনূভুত হচ্ছে। আমরা পরবর্তি বিশ্বপরিস্থিতি পর্যালোচা করে সবজি ও শস্যের বীজ বিতরণ কর্মসূচিও পালন করছি, আলহামদুলিল্লাহ।

প্রতিবেদককে লক্ষ করে তিনি বলেন,আপনি জানেন হয়তো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজ ও শহরগুলোতে অভুক্ত প্রাণীদের খাবারের ব্যবস্থা করে সচেতন মহলের চোখে সুনাম অর্জন করেছে আমাদের সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

পাঠক আরও দেখে থাকবেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম পীর সাহেব চরমোনাই সৃষ্ট এ সংকটের শুরুতেই ঘোষণা করেছেন দেশব্যাপী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও এর সকল সহযোগী সংগঠন যেন গণমানুষের পাশে থাকে এবং আমীরের নির্দেশেই প্রথমে জেলায় জেলায় পরে থানা পর্যায়ে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃতদের ‘লাশ দাফন কমিটি’ গঠিত হয়। সেখানেও ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন সরব উপস্থিতি জানান দিয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ।

যদি একবাক্যে বলি, তাহলে আমরা শুরু থেকে লিফলেট বিতরণ, মাস্ক, হ্যান্ড সেনিটাইজার, হ্যান্ডওয়াস ও সাবান বিতরণ, খাদ্যসামগ্রী ও নগদ অর্থ বিতরণ, বিপদমুক্তির জন্য রোজা পালন ও রোগমুক্তির জন্য খতমে শিফা, ধান কাটা ও বীজ বিতরণ এবং ইফতারসামগ্রী বিতরণ, পশুদের পরিপালন ও লাশ দাফন-কাফনসহ গণমুখী সবধরনের কর্মসূচি আমরা গ্রহণ করেছি।
এছাড়াও ব্যাপকহারে সরকারি ত্রাণের চালচুরি, গার্মেন্টস শ্রমিকদের সাথে তামাশা ও স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদেও আমরা সরব আছি, আলহামদুলিল্লাহ।

আর্থিক সংকট উত্তরণে কী করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, অসচ্ছল ও দরিদ্র দলীয় কর্মীদের প্রতিও আমরা বিশেষ দৃষ্টি রেখেছি এবং সাধ্যমতো তাদের অনেকের পরিবারেও সহযোগিতা পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করেছি। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় নেহায়েত কম। আমাদের সামর্থের তুলনায় মোটামুটি আলহামদুলিল্লাহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *