শরিয়তের আলোকে কাযা নামায ও বিভ্রান্তি নিরসন

ইসলাম ইসলামি আইন

 মুফতি সৈয়দ নাছির উদ্দিন আহমদ

সাম্প্রতিক সময়ে কতেক নামধারী আলেম যারা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান ছুটে যাওয়া নামাযের কাযা সংক্রান্ত বিষয়ে বিভ্রান্তিকর ফাতাওয়া দিয়ে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। তারা বলেন, ছুটে যাওয়া পূর্বের নামাযগুলোর কাযা পড়তে হয়না,এর জন্য তাওবা করে নিলেই হয় ।

শুধু তাই নয়; বরং তাদের দাবি হচ্ছে, কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত সালাত ছাড়লে এর কাযা নেই, তাওবাই তার একমাত্র মুক্তির পথ।খালিস তাওবাহ ছাড়া সে কখনো মুক্তি পাবে না।

একথার স্বপক্ষে তাদের মনগড়া যুক্তি হচ্ছে, হাদীসের কোথাও ইচ্ছাকৃত নামায বর্জন করে কাযা করে পার পেয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়নি। এমনকি যেখানে নামাযের কাযার বিধান দেওয়া হয়েছে সেখানেও ইচ্ছাকৃত বর্জিত নামাযের কাযার কথা বলা হয়নি।বরং এটি এমন এক অপরাধ যার বিকল্প কাযা নয় ।

তাই সালাতের বেলায় ইচ্ছাকৃত পরিত্যাগ করা সালাত কাযার কোনো সুযোগ নেই।সালাত ঈমানের নিদর্শন এবং তা নির্ধারিত সময়ে আদায় করা ফরয। ইচ্ছা করে কেউ সালাত পরিত্যাগ করলে সে কুফরী কাজ করেছে।আর সকল কুফরী অপরাধ থেকে মুক্তির যে উপায় ইচ্ছাকৃত সালাত বর্জনের অপরাধ থেকে মুক্তিরও সেই একই উপায়। অর্থাৎ কাযা আদায় নয় খালিস তাওবা করা।নিতান্তই এটি তাদের ভ্রান্ত মতবাদ।

তাদের আরো বিভ্রান্তিকর বক্তব্য হচ্ছে, উমরী কাযা বলতে কুরআন সুন্নাহ সমর্থিত বা প্রমাণিত কোন আমল নেই বরং উমরী কাযায় সময় ব্যয় না করে নফল ও তাহাজ্জুদ বা সুন্নাত আদায় করা উচিত।

তাদের এসব বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের সঠিক

সমাধান নিয়ে শরিআতের আলোকে দালীলিক আলোচনা তুুুুলে ধরার চেষ্টা করছি ইনশাআল্লাহ।
ইসলামী আহকামের মধ্যে নামায হল একটি সর্বশ্রেষ্ট হুকুম । ইচ্ছা করে নামায তরক করা কবীরা গুনাহ। নামায তরক হলে তা নিয়মমাফিক কাযা করা জরুরী।
জমহুর ফুকাহায়ে কেরামগণ সকলেই একথার উপর ঐক্যমতপোষন করেছেন যে,ছুটে যাওয়া নামাযের কাযা আদায় করা আবশ্যক।
চাই ইচ্ছায় কাযা হোক বা অনিচ্ছাকৃত হোক। কম কাযা হোক বা বেশী। সর্বাবস্থায় কাযা করতে হবে।
আর শারীরিক শক্তি না থাকলে ফিদয়া দিতে হবে বা ওসীয়ত করে যেতে হবে।
তাওবার দ্বারা কাযা নামায মাফ হবেনা । যদিও সারা জীবনের নামায কায়া হোক না কেন । তবে কেউ যদি কাযা করা আরম্ভ করে আর এর মধ্যে তার মৃত্যু এসে পরে এবং ফিদয়া দিতে সক্ষম না হয় , তাহলে সে ব্যক্তি ইস্তেগফার করতে থাকবে। এতে আশা করা যা,আল্লাহ পাক ক্ষমা করে দিবেন। তবে শুধুমাত্র তাওবাই যথেষ্ট বলা যাবেনা।

দলিলভিত্তিক বিস্তারিত আলোচনা নিম্নে পেশ করছি:

ছুটে যাওয়া নামাযের কাযা আদায়ের ব্যাপারে চার মাজহাবের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এই যে,কারণে অকারণে যেভাবে হোক কারো নামায ছুটে গেলে পরবর্তীতে এর কাযা অবশ্যই আদায় করতে হবে।আর এটা কুরআন সুন্নাহর আলোকে গৃহীত মত।
তাছাড়া উমরী কাযাও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত এটাকে অস্বিকার করা হাদীস অস্বিকার করার নামান্তর।

সহীহ বুখারীতে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা:) থেকে বর্ণিত,
من نسي صلاة فليصل إذا ذكرها .لا كفارة لها إلا ذلك
যে ব্যক্তি নামায পড়তে ভুলে যায় তার উপর আবশ্যক হল যখন ছুটে যাওয়া নামাযের কথা স্মরণ হবে তখনি তা পড়ে নিবে । ইহা ব্যতীত এর কোন কাফফারা নেই ।(বুখারী শরীফ পরিচ্ছেদ ৩৭,হাদীস নম্বর ৫৯৭,পৃষ্ঠা নম্বর ১/৮৪)
অন্য হাদীস শরীফে আনাস ইবনে মালিক(রা:) থেকে বর্ণিত,
من نسي صلاة أو نام عنها فكفارتها أن يصليها إذا ذكرها
যে ব্যক্তি নামাযের কথা ভুলে যায় কিংবা নামায না পড়ে ঘুমিয়ে থাকে তার কাফফারা হল,যখন নামাযের কথা স্মরণ হবে তখন তা আদায় করা। (সহীহ বুখারী, হাদীস :৫৯৭৬)
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم
إِذَا رَقَدَ أَحَدُكُمْ عَنِ الصَّلاَةِ أَوْ غَفَلَ عَنْهَا فَلْيُصَلِّهَا إِذَا ذَكَرَهَا فَإِنَّ اللَّهَ يَقُولُ أَقِمِ الصَّلاَةَ لِذِكْرِى
অনুবাদ-যখন তোমাদের কেউ নামায ছেড়ে ঘুমি পড়ে, বা নামায থেকে গাফেল হয়ে যায়, তাহলে তার যখন বোধোদয় হবে তখন সে যেন তা আদায় করে নেয়। কেননা আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-আমাকে স্মরণ হলে নামায আদায় কর। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৬০১ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১২৯৩২ সুনানে বায়হাকী কুবরা, হাদীস নং-৪১৮২)
عن أنس بن مالك قال: سئل رسول الله صلى الله عليه وسلم عن الرجل يرقد عن الصلاة أو يغفل عنها قال : كفارتها يصليها إذا ذكرها
হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ)থেকে বর্ণিত,রাসূল (সাঃ) কে নামায রেখে ঘুমিয়ে যাওয়া ব্যক্তি ও নামায সম্পর্কে গাফেল ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন-এর কাফফারা হল যখনই নামাযের কথা স্মরণ হবে তখনই তা আদায় করে নিবে।
(সহীহ ইবনে খুজাইমা, হাদীস নং-৯৯১ মুসনাদে আবী আওয়ানা, হাদীস নং-১০৪১ মুসনাদে আবী ইয়ালা, হাদীস নং-৩০৬৫ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৩২৬২ সুনানে নাসায়ী কুবরা, হাদীস নং-১৫৮৫)
عن جابر بن عبد الله : أن عمر بن الخطاب جاء يوم الخندق
بعدما غربت الشمس فجعل يسب كفار قريش قال يا رسول الله ما كدت أصلي العصر حتى كادت الشمس تغرب قال
النبي صلى الله عليه و سلم ( والله ما صليتها ) . فقمنا إلى بطحان فتوضأ للصلاة وتوضأنا لها فصلى العصر بعدما غربت الشمس ثم صلى بعدها المغرب-
হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রা.)থেকে বর্ণিত-ওমর বিন খাত্তাব (রা.)খন্দকের দিন সূর্য ডুবার পর কুরাইশ কাফেরদের তিরস্কার করতে করতে এলেন। নবীজী (সাঃ)কে বললেন-“হে আল্লাহর নবী! আমি আসরের নামায পড়তে পারিনি এরই মাঝে সূর্য ডুবে গেছে”। নবীজী (সাঃ) বললেন-“হায় আল্লাহ! আমরাও তো পড়তে পারিনি!
তারপর আমরা সমতল ভূমিতে দাঁড়ালাম। আর তিনি নামাযের জন্য অযু করলেন। আর আমরাও নামাযের জন্য অযু করলাম। তারপর সূর্য ডুবে গেলেও প্রথমে আমরা আসর পড়লাম। তারপর মাগরিব পড়লাম। (বুখারী শরীফ-হাদিস নং-৫৭১,৫৭৩,৬১৫,৯০৩,৩৮৮৬,)
ঐ সমস্ত হাদীস সমুহে হুজুর (সা:) এই মূলনীতি বলে দিয়েছেন,যখন কোন ব্যক্তি কোন নামায ছেড়ে দিবে স্মরণ হওয়ার সাথে সাথে ছুটে যাওয়া নামায পড়ে নিবে। চায় তা ইচ্ছাকৃতভাবে হোক বা অনিচ্ছাকৃত ভাবে হোক । ঘুমের কারণে কিংবা অলসতার কারণে হোক,স্মরণ হলেই কাযাকৃত নামায পড়ে নিতে হবে।
হাম্বলী মাজহাবের অনুসারী ও তাদের নির্ভরযোগ্য ভাষ্যকার আল্লামা মুরদাওয়ী হাম্বলী (রাহ:) বর্ণনা করেন,যে ব্যক্তির অনেক নামায কাযা হয়ে যায়,তার উপর জরুরী হল তাৎক্ষণিক কাযা আদায় করে নেওয়া ।
তবে হ্যাঁ, কাযা আদায় করতে গিয়ে যদি শারীরিক কিংবা জরুরী জীবন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্তের সম্মুখীন হয় তাহলে তার উপর থেকে তাৎক্ষনিক আদায় করার  হুকুম রহিত হয়ে যাবে । এবং তার জন্য বিলম্বে আদায় করা বৈধ হবে । তবে ছুটে যাওয়া নামায পরবর্তীতে অবশ্যই তাকে পড়তে হবে ।
(الإنصاف للمرداوى رح٤٤٢/ ١)

ইমাম শাফয়ী (রাহ:) এর মাজহাব হল যদি কোনো শরয়ী ওজরে নামায ছুটে যায় তাহলে কাযাকৃত নামায তাৎক্ষণিক আদায় না করে বিলম্বে আদায় করার সুযোগ আছে ।
অর্থাৎ কারো নামায কোন কারণে কাযা হলে শাফয়ী মাজহাব মতে বিলম্ব করে আদায় করাও জায়েজ আছে।
কিন্তু যদি অকারণে কিংবা ইচ্ছাকৃত কারো নামায ছুটে যায় তাহলে তাৎক্ষণিক সেই ছুটে যাওয়া নামায আদায় করে নিতে হবে এটা তার জন্য আবশ্যক । আর এটি হল শাফয়ী মাজহাবের প্রাধান্যতম মত।
(فتح الجواد ١/٢٢٣)
উল্লেখিত বর্ণনাগুলো প্রমাণ করে নামায মূলত জিম্মা থেকে মাফ হয়না। তাই সময় সুযোগ পেলেই পূর্বের কাযা নামায আদাই করাই বাঞ্ছনীয়। নামাযের মত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত কাযা হবার পর তাকে গাফলতীর সাথে অনাদায় রাখাটা চরম উদাসীনতা।
আর নিজে সে ইবাদত কাযা না করাটা এক ধরণের গাফলতী,সেই সাথে অন্যকে ফাতওয়া দিয়ে কাযা আদায় করতে বিরত রাখাটা চরম পর্যায়ের ইবাদত বিদ্বেষী মনোভাবের প্রতিফলন ছাড়া আর কিছু নয়।
তাই যে কেউ যদি এরূপ বলে, কারো ছুটে যাওয়া নামায অধিক হলে এর কাযা আদায় করার প্রয়োজন নেই ক্ষমা চেয়ে নেওয়াই যথেষ্ট, তাহলে তা হবে কুরআন সুন্নাহের স্পষ্ট প্রমান ও উম্মতে ফুকাহায়ে কেরামের ঐক্যবদ্ধ মতের সম্পুর্ন বিপরীত ও গোমরাহী কথা ।

তাছাড়া উমরী কাযা ভিত্তিহীন, কাযা আদায় না করে শুধু তাওবাই যথেষ্ট এসব কথা বলাও সহীহ নয় ।
কারণ তাওবা কবুলের জন্য শর্ত হল মানুষ নিজে যে ত্রুটি করেছে যথাসম্ভব তা পালন করে নেয়া এরপর ক্ষমা চাওয়া ।
তদ্রূপ একথাও সহীহ নয় যে,উমরী কাযায় সময় ব্যয় না করে নফল ও তাহাজ্জুদ আদায় করা উচিত।
উমরী কাযা থেকে নফল ইত্যাদি আদায় করা উত্তম এর স্বপক্ষে যে দলীল পেশ করা হয় তাও ঠিক নয় ।
কারণ সুনানে আবু দাউদে তাদের সেই হাদীসটির মূল পাঠ হল-
إن أول ما يحاسب الناس به يوم القيامة من أعمالهم
الصلاة، قال يقول ربنا عز وجل لملائكته وهو أعلم انظروها في صلاة عبدي أتمها أم نقصها؟ فإن كانت تامة كتبت له تامة وإن كان انتقص منها شيئا قال انظروا هل لعبدي من تطوع؟ فإن كان له تطوع قال أتموا لعبدي فريضة من تطوعه
কেয়ামতের দিন মানুষের সর্বপ্রথম যে আমল নেওয়া হবে তা হল নামায।
আল্লাহ পাক ফেরেশতাদেরকে বলবেন,তোমরা আমার বান্দার ফরয নাময দেখো।
সে পূর্ণরূপে তা আদায় করেছে,নাকি তা আদায়ে কোনো ত্রুটি করেছে?
যদি পূর্ণরূপে আদায় করে থাকে তবে তার জন্য পূর্ণ নামাযের ছওয়াব লেখা হবে।
আর আদায়ে কোনো ত্রুটি করে থাকলে আল্লাহ পাক ফেরেশতাদেরকে বলবেন,দেখ, আমার বান্দার নফল নামায আছে কি না? যদি থাকে তবে এর দ্বারা তার ফরয নামায আদায়ে যে ত্রুটি হয়েছে তা পূর্ণ করে দাও।(সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৮৬৪)
উক্ত হাদীসে ‘কারো ফরয নামায কম পড়ে গেলে নফল দ্বারা তা পূর্ণ করা হবে এমন কথা নেই,ববং এতে রয়েছে,আদায়কৃত নামাযে ত্রুটির বিষয়।
সুতারাং বর্ণিত হাদীসের উপর ভিত্তি করে কাযা নামায আদায় না করে নফল ইত্যাদি পড়া উত্তম বা উচিত এরকম বলা গোমরাহী আর ভ্রষ্টতা ছাড়া কিছুই নয়। তাই এসব বাতিলপন্থী ও কুরআন সুন্নাহের অপব্যাখ্যাকারী ভ্রান্ত চিন্তার ধারকদের থেকে দূরে থাকা জরুরী।

(ফয়যুল কাদীর ৩/৮৭; ইতহাফু সাদাতিল মুত্তাকীন ৩/১১; আলফাতহুর রববানী ১/১৮২)
পরিশেষে এব্যাপারে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) এর ফাতওয়া দিয়ে আমার আলোচনার ইতি টানছি।
المسارعة الى قضاء الفوائت الحثيرة اولى من الأشتغال
بالنوافل، واما مع قلة الفوائت فقضاء السنن معها احسن،
অনুবাদ-যদি কাযা নামাযের পরিমাণ অনেক বেশি হয়,তবে সুন্নাত নামাযে লিপ্ত হওয়ার চেয়ে ফরয নামাযসমূহ আদায় করাই উত্তম।
আর যদি কারো কাযা নামাযের পরিমাণ কম হয়,তবে ফরযের সাথে সুন্নাত নামায আদায় করলে তা একটি উত্তম কাজ হবে।
(ফাতওয়া ইবনে তাইমিয়া-২২/১০৪)

তাছাড়া অনুরূপ ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়ায়ও বলা হয়েছে কাযা নামায আদায় করা নফল পড়ার চাইতে উত্তম।
الأشتغال بالفوائت أولي وأهم من النوافل الأ السنن المعرفة ( الفتوى الهنديه ١/١٢٥)(كتاب الفتوى ٤٢٠/٢)
(আরো দেখতে পড়ুন ফাতাওয়ায়ে উসমানী ১/৫২১# ফাতাওয়া দারুল উলুম,৪/৩২২-৩৩৬ ইমদাদুল ফাতাওয়া ১/৩৩৮ কিফায়াতুল মুফতি ৩/৩৩৮ খাইরুল ফাতাওয়া ২/৬০৭)

আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে সঠিক দ্বীনের উপর চলার তাওফিক দান করত বাতিল ফিরকার ষড়যন্ত্র থেকে হেফাজত করুন।আমীন।

লেখক:কলামিস্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *