শরীয়তের দৃষ্টিতে ‘শবে-বরাআত’ করণীয় ও বর্জনীয়

ইসলাম

• মুফতি সৈয়দ নাছির উদ্দীন আহমদ •

শরীয়তের একটি মূলনীতি হল কোন আমল সুস্পষ্ট দলীল পবিত্র কুরআনে পাওয়া গেলে হাদিস শরীফে তা পাওয়া আবশ্যক নয় তবে ভালো ।কুরআনে না পাওয়া গেলে যদি হাদীসের মধ্যে পাওয়া যায় তখন ইজমা কিংবা কিয়াসে তা দেখতে হয়না । কিন্তু যদি কোন বিষয় হাদীসের মধ্যে না পাওয়া যায় তাহলে তখন দৃষ্টি দিতে হয় ইজমা আর কিয়াসের দিকে। ইজমা বা কিয়াস দ্বারা যদি বিষয়টি সুপ্রমানিত হয় তাহলে সেটিও অবশ্যই শরীয়তের বিধান হিশেবে সর্বজন স্বীকৃত।

অধুনা যুগে মানুষ প্রায় সকল ক্ষেত্রেই দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে । কেউ চরমপন্থী কেউ বা উদারপন্থী।ধর্মীয় বিষয়ের পাশাপাশি পার্থিব বিষয়েও আমাদের মাঝে এই বিভক্তির হাওয়া বইতে শুরু করেছে।এমনই দ্বিমুখী দৃষ্টিভঙ্গীর শিকার হয়েছে বরকতময় শবেবরাতের বিষয়টিও।

একদল এই শবেবরাতের অস্তিত্বকে অস্বীকার করেন । অপর দল একে নিয়ে অতিশয় বাড়াবাড়ি করেন।

এমনকি শবেবরাতকে কেন্দ্র করে ওরা এবাদতকে শরীয়ত বিরোধী যাবতীয় কুসংস্কার ও বিদআতের সংমিশ্রণের মাঝে জট পাকিয়ে ফেলে।অথচ আমরা উম্মতে মুহাম্মদিয়া হলাম أمة وسطا তথা মধ্যপন্থী উম্মত হিশেবেই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসমৃদ্ব।

তাই বিষয়টি সাধারণ মুসলমানদের সামনে পরিস্কার ও সঠিকভাবে উপস্থাপন করার জন্য সংক্ষিপ্ত আলোচনা।

আসুন আমরা জেনে নেই শরীয়তের দৃষ্টিতে পবিত্র শবেবরাত আছে কি না?এর দালিলিক আলোচনা কি?

বার মাস সম্বলিত আরবী বছরের অষ্টম মাস হল মাহে শাবান । যা রমজানের পূর্ববর্তী সময়ে অবস্থিত । এই শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিনগত রাতকে ফার্সী ভাষায় শবে বরাত বলা হয় । ফার্সীতে শব অর্থ রাত/রজনী; বরাত অর্থ হচ্ছে ভাগ্য । শবে বরাত অর্থ হল ভাগ্যরজনী । আর শব শব্দের আরবী অনুবাদ প্রতিশব্দ হলো লাইলাতুন ।

কাজেই আরবী ভাষারীতির আলোকে বলতে হবে ليلة البراة লাইলাতুল বারাআত বা পরিত্রাণের রজনী । এই রাতকে হাদীসের ভাষায় লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান (ليلة النصف من شعبان) অর্থাৎ শাবান মাসের মধ্যরাত্রি বলা হয়। তবে সাধারণ মুসলমানদের মাঝে প্রসিদ্ধ লাভ করেছে শবে বরাত নামে।এজন্য এটাকে আমরা শবেবরাত বলে থাকি ।

এখানে একটি বিষয় অতি পরিষ্কার হওয়া উচিত যে, শবে বরাত আরবী নয় বরং এটি একটি ফার্সী শব্দ। এজন্য এ শব্দটি কুরআন হাদীসের কোথাও উল্লেখ নেই থাকার কথাও না । যেমন নামায,রোজা কুরআন হাদিসে ব্যবহৃত হয়নি । বরং তদস্হলে সালাত সিয়াম ইত্যাদি আরবী শব্দ ব্যবহার হয়েছে । কিন্তু আফসোসের বিষয় কেউ কেউ “শবে বরাআত” নামে হাদিসে শব্দ না থাকায় এ রাতকে অস্বিকার করার মত খোড়া যুক্তি দিয়ে থাকেন।

তাদেরকে আমি বলি-আমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়া আবশ্যক বলি কুরআন হাদিসে বর্ণিত নির্দেশের কারণে। কিন্তু কুরআন হাদিসের কোথাও কি নামায শব্দ আছে? আমরা যাকে নামায বলি সেই অর্থবোধক কুরআন হাদিসের উদ্ধৃত শব্দ “সালাত”ই হল নামায। তেমনি আমরা যাকে “শবে বারাআত” বলি তথা শাবানের পনের তারিখের রাত বলে থাকি এই অর্থবোধক শব্দ হাদিসে পাওয়া গেলে তা’ই হবে শবে বারাআত। আর এই অর্থবোধক হাদীসে বর্ণিত শব্দ হল “লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান”। সুতরাং তাই হল শবে বারাআত। শবে বরাত বা লাইলাতুল বারাআত শব্দের অর্থ মুক্তি লাভ । হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী এ রাত্রিতে যেহেতু আল্লাহ পাক নেক বান্দাদের বৃহৎ দলের গুনাহ মাফ করে দিয়ে জাহান্নাম থেকে মুক্তি প্রদান করে দেন । তাই এ রাতটিকে লাইলাতুল বারাআত বলে নামকরণ করা হয়েছে । এর প্রমাণ স্বরূপ দেখুন ( তাফসীরে কবীর ১৪/২৩৯ – তাফসীরে রুহুল বয়ান ৮/৪০৪)

☆ হাদিসের আলোকে শবে বারাআত ☆

কুরআনে শবে বারাআতের কোন সুস্পষ্ট উল্লেখ নাই।কুরআনে কেবল “লাইলাতুল কদর” তথা “শবে কদর” এর কথা উল্লেখ আছে। পবিত্র কুরআনের পঁচিশ নাম্বার পাড়ার সূরায়ে দুখানের ২ ও ৩ নং আয়াতে বর্ণিত মুবারক রজনী দ্বারা লাইলাতুল কদর তথা শবে কদর উদ্দেশ্য। শবে বারাআত নয়। এটাই বিশুদ্ধ বলেছেন,গ্রহণযোগ্য মুফাসসিরীনে কেরাম। যার পক্ষে যুক্তিও শক্তিশালী। বিস্তারিত জানতে দেখুন-

১ আদ দুররুল মানসুর-৭/৪০১-৪০৭

২ তাফসীরে কাশশাফ-৪/২৭২

৩ তাফসীরে ইবনে কাসীর-৭/২৪৬

৪ তাফসীরে বাগাভী-৭/২২৭-২২৮

তবে যারা শবে বরাতের ফজিলতকে অস্বীকার ও এ রাতে জাগরণ থেকে নফল এবাদত বন্দেগি যেমন:- যিকির,তেলাওয়াত ইত্যাদিকে বিদআত মনে করেন ।

তাদের ব্যাপারে আমরা এটুকু বলবো যে,এটা মুলত কুরআন হাদীসের জ্ঞান সম্পর্কে আপনাদের অজ্ঞতা বৈ কিছু নয়। কারণ সাহাবায়ে কেরামের এক জলীলুল ক্বদর দল থেকে বিভিন্নসুত্রে শবে বরাতের ফজিলত সম্পর্কিত বহু বর্ণনা হাদীসগ্রন্থসমুহে বিদ্যমান । যেসব বর্ণনার সূত্রগুলো কিছু সহীহ আর কিছু হাসান তথা সহীহের অন্তর্ভূত আর কিছু জঈফ যা পরস্পর পরস্পরকে শক্তিশালী করে আমলের যোগ্য করে তুলে । এই কারণেই শরীয়তে শবে বরাতের ফজিলতকে ভিত্তিহীন বলার কোন সুযোগ নেই ।দেখুন বিভিন্ন হাদিসে শবে বারাআতের বর্ণনা এসেছে। যেমন-

عن معاذ بن جبل رضي الله عنه عن النبي صلى الله عليه وسلم قال يطلع الله الي جميع خلقه ليلة النصف من شعبان فيغفر لجميع خلقه إلا لمشرك و لمشاحن (أخرجه الطبراني في الكبير ٢٠/١٠٨ وفي الأوسط ٧/٦٧(٦٧٧٦) وابن حبان في صحيحه ١٢/٤٨١(٥٦٦٥) والبيهقي في شعب الإيمان ٥/٢٧٢ )

অনুবাদ:- হযরত মু’আয ইবনে জাবল (রা:) রাসুলুল্লাহ (সা:) থেকে বর্ণনা করেন, আল্লাহ পাক শাবান মাসের পনের তারিখ রাতে সৃষ্টিকূলের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দান করে ক্ষমা করে দেন । কিন্তু মুশরিক ও হিংসুক ছাড়া।হাদীসটির মান হাসান লি-জাতিহী । দেখুন: (মাজমায়ুয যাওয়ায়িদ লিল-হাইছমী ৮/৬৫)

বর্তমান সময়ের প্রসিদ্ধ শায়খ নাসিরুদ্দিন আলবানী (রহঃ) সিলসিলাতুল আহাদসিস্‌ সাহীহা ৩/১৩৫-১৩৯ এ এই হাদীসের সমর্থনে আরো কিছু হাদীস উল্লেখ করার পর লেখেন:

وجملة القول أن الحديث بمجموع هذه الطرق صحيح بلاريب.والصحة تثبت بأقل منها عددا، مادامت سالمة من الضعف الشديد، كماهو الشأن فى هذاالحديث:

এ সব রেওয়াতের মাধ্যমে সমষ্টিগতভাবে এই হাদীসটি নিঃসন্দেহে সহীহ প্রমাণিত হয়। তারপর আলবানী (রহঃ) ওইসব লোকের বক্তব্য খন্ডন করটা, যারা কোন ধরণের খোঁজখবর ছাড়াই বলে দেন যে,শবে বরাতের ব্যাপারে কোন সহীহ হাদীস নেই।

عن ابی بکر الصديق رضي الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم إذا كانت ليلة النصف من شعبان ينزل الله تبارك وتعالى إلى سماء الدنيا فيغفر لعباده الا ما كان من مشرك أو مشاحن لأخيه (اخرجه البيهقي في شعب الإيمان ٣/٣٨١(٣٨٢٧)

হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা:) থেকে বর্ণিত হুজুর (সা:) বলেছেন,শাবান মাসের পঞ্চদশ রজনীর আগমণ হলে মহান আল্লাহ পৃথিবীর আসমানে তাশরীফ আনেন এবং স্বীয় বান্দাদিগকে মাফ করে দেন । কিন্তু মুশরিক ও অপর ভাইয়ের সাথে হিংসা পোষনকারী ব্যতীত ।

হাদীসটির ব্যাপারে হাফিজ যকী উদ্দীন আল মুনযরী (মৃত:৬৫৭) বলেন,বাযযার ও বায়হাকি এ হাদীসটিকে لا بأس به ( সনদে কোন সমস্যা নেই ) সনদের সাথে বর্ণনা করেছেন ।

(দেখুন :- الترغيب والترهيب من الحديث الشريف للحافظ المنذري ٤/٢٣٨)

উল্লেখ্য যে,মুহাদ্দীসগণ কোন হাদীসের ব্যাপারে لا بأس به বললে হাদীসটি শক্তিশালী হওয়ার প্রতি নির্দেশক ।

ﻋﻦ ﻋﺎﺋﺸﺔ : ﻗﺎﻟﺖ ﻓﻘﺪﺕ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ ﻟﻴﻠﺔ ﻓﺨﺮﺟﺖ ﻓﺈﺫﺍ ﻫﻮ ﺑﺎﻟﺒﻘﻴﻊ ﻓﻘﺎﻝ ﺃﻛﻨﺖ ﺗﺨﺎﻓﻴﻦ ﺃﻥ ﻳﺤﻴﻒ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻚ ﻭﺭﺳﻮﻟﻪ ؟ ﻗﻠﺖ ﻳﺎ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺇﻧﻲ ﻇﻨﻨﺖ ﺃﻧﻚ ﺃﺗﻴﺖ ﺑﻌﺾ ﻧﺴﺎﺀﻙ ﻓﻘﺎﻝ ﺇﻥ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﺰ ﻭ ﺟﻞ ﻳﻨﺰﻝ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻨﺼﻒ ﻣﻦ ﺷﻌﺒﺎﻥ ﺇﻟﻰ ﺍﻟﺴﻤﺎﺀ ﺍﻟﺪﻧﻴﺎ ﻓﻴﻔﻐﺮ ﻷﻛﺜﺮ ﻣﻦ ﻋﺪﺩ ﺷﻌﺮ ﻏﻨﻢ ﻛﻠﺐ

অনুবাদ-হযরত আয়শা (রাঃ) বলেন,এক রাতে রাসুল (সাঃ) কে না পেয়ে খুজতে বের হলাম। খুঁজতে খুঁজতে জান্নাতুল বাকীতে (মদীনার কবরস্থান) গিয়ে আমি তাঁকেদেখতে পেলাম। তিনি বললেন-কি ব্যাপার আয়শা?(তুমি যে তালাশে বের হলে?) তোমার কি মনে হয় আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল তোমার উপর কোন অবিচার করবেন? (তোমার পাওনা রাতে অন্য কোন বিবির ঘরে গিয়ে রাত্রিযাপন করবেন?)

হযরত আয়শা (রাঃ) বললেন- আমার ধারণা হয়েছিল, আপনি অন্য কোন বিবির ঘরে গিয়েছেন। রাসূল (সাঃ) তখন বললেন-যখন শাবান মাসের ১৫ই রাত আসে অর্থাৎ যখন শবে বরাত হয়,তখন আল্লাহ পাক এ’রাতে প্রথম আসমানে নেমে আসেন।তারপর বনু কালব গোত্রের বকরীর পশমের চেয়ে বেশী সংখ্যক বান্দাদেরকে ক্ষমা করে দেন। (সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং-৭৩৯, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২৬০২৮)

হাদীসটির ব্যাপারে কথা হচ্ছে অন্য আরো হাদীসের সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতায় হাদীসটি শক্তিশালী হয়ে যায় । সুতারাং হাদীসটির মান হাসান এবং সহীহ লিগাইরিহী এর স্তরে । ( দেখুন শরহুল মাওয়াহিবিল লাদুন্নিয়্যাতে ৭/৪৪১)

ﻋﻦ ﻋﻠﻲ ﺑﻦ ﺃﺑﻲ ﻃﺎﻟﺐ ﻗﺎﻝ ﻗﺎﻝ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ‏( ﺇﺫﺍ ﻛﺎﻧﺖ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻨﺼﻒ ﻣﻦ ﺷﻌﺒﺎﻥ ﻓﻘﻮﻣﻮﺍﻟﻴﻠﻬﺎﻭﺻﻮﻣﻮﺍ ﻧﻬﺎﺭﻫﺎ-

হযরত আলী বিন আবু তালীব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন-যখন শাবান মাসের অর্ধেকের রজনী আসে (শবে বরাত) তখন তোমরা রাতে নামায পড়, আর দিনের বেলা রোযা রাখ,–(সূনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১৩৮৮, শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং-৩৮২২) এই হাদীসটি দুর্বল হলেও ফজিলতের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য তবে এটিকে নিয়ে বাড়াবাড়ির সুযোগ নেই । কারণ শাবানের পঞ্চদশ দিবসে রোযা রাখাকে মুস্তাহাব বলেছেন ফকীহগণ ।

রাখলে ভালো অন্যথায় কাউকে কিছু বলা যাবেনা।

অনেক গায়রে মুকাল্লিদ ভাই প্রশ্ন করে থাকেন যে, এ রাত ফযীলতপূর্ণ একথা ঠিক আছে। কিন্তু এ রাতে আমল করতে হবে একথাতো কোথাও নেই। তাই আমল করা জায়েজ হবে না,বরং বেদআত হবে।

জবাব:- বড়ই আশ্চর্য প্রকার বলে থাকেন তারা। যে সময় ফযীলতপূর্ণ,সে সময় ইবাদত করা নিষিদ্ধ। তাহলে সে সময় ফযীলতপূর্ণ হয়ে লাভ কি?

ফযীলত বলা মানেই হল এ সময় ঘুমিয়ে না থেকে ইবাদতে নিমগ্ন হওয়ার তাকীদ দিচ্ছেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। ঘুমিয়ে থাকলে ফযীলত অর্জিত হবে কিভাবে?

আল্লামা ইবনে নুজাইম হানাফী(রহ:)বলেন,রমজানের শেষ দশ রাতে,দুই ঈদের রাতে,পহেলা জিলহজ্ব রাতে, শাবানের পনের তারিখ রাতে জাগ্রত থেকে ইবাদত করা মুস্তাহাবের অন্তর্ভুক্ত । যেমনটি হাদীস সমুহে এসেছে ।(দেখুন আল-বাহরুর রায়িক ২/৫৬)

কথা হচ্ছে এ রাতকে কেন্দ্র করে কোন বাড়াবাড়ি বা ছাড়াছাড়ির সুযোগ ইসলামে নেই এ কথা মনে রাখা।

● এ রাতে করণীয় কিছু বিষয় :

শবে বরাতে এমনকি শবে কদরেও নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট কোন আমল নেই । সবাই কোথাও একত্র হয়ে সম্মিলিত কোন আমলও নেই। তাই ঐ রাতে জিকির,কুরআন তেলাওয়াত ও নফল নামাজ পড়া সহ সালাতুত তাসবিহ ইত্যাদি এবাদত বেশি করে করা যেতে পারে । এবাদত করতে গিয়ে নিজের স্বাস্থ্যতার প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে । এমন যেন না হয় যে,এবাদত করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন ।

তবে নফল ইবাদত একা এবং নিজ ঘরে আদায় করা উত্তম। সুতারাং শবে বরাতের এবাদতও মসজিদে না গিয়ে ঘরে আদায় করা উচিত ।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা:) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন,

1348 حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الْمُثَنَّى ، حَدَّثَنَا يَحْيَى ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ ، قَالَ : أَخْبَرَنِي نَافِعٌ ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، قَالَ : اجْعَلُوا مِنْ صَلَاتِكُمْ فِي بُيُوتِكُمْ ، وَلَا تَتَّخِذُوهَا قُبُورًا(صحیح مسلم حدیث نمبر ١٣٤٨)

ইবন উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’তোমাদের ঘরেও কিছু সলাত আদায় করবে এবং ঘরকে কবর বানিয়ে নিও না’’।অর্থাৎ- তোমরা ঘরকে কবরের মতো করে ফেলো না যেখানে কোন ‘ইবাদাত করা যায় না। বরং ঘরেও তোমরা সলাত আদায় কর এবং ‘ইবাদাতের একটি অংশ তাতে আদায় কর।

তাই বিশেষ করে বর্তমান সমগ্র বিশ্বে করোনা ভাইরাস নামক যে মহামারী রোগ বিস্তৃত আছে এর ভয়াবহ প্রক্রিয়া থেকে পরিত্রাণের জন্য দেশের উলামায়ে কেরাম ও সসরকারের পক্ষ হতে যে সমস্ত সতর্কতামুলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে এর মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে লোক সমাগম এড়িয়ে থাকা । মসজিদে মসল্লিদের আগমন সীমিত হওয়া ।

তাই অনুরোধ থাকবে আগামী শবেবরাতে আমরা যেন নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করে আল্লাহর দরবারে আহাজারি ও নেক আমল সুন্নাহ মোতাবেক করি । এই করুণ অবস্থা থেকে আল্লাহর কাছে মুক্তির প্রার্থনা করি । এবং মসজিদ ও ঘরের বাইরে লোক সমাগম না ঘটাই । সে হিশেবে এ রাতে আমাদের করণীয় ও বর্জনীয় দিকগুলো নিম্নে পেশ করছি ।

আলী ইবনে আবু তালিবের বর্ণিত হাদীসের আলোকে এ রাতের আমল হল-

১-ইস্তিগফার তথা আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করা।

২-আড়ম্বরপূর্ণভাবে নয় স্বাভাবিকভাবে হলে কবর যিয়ারত করা।

৩-অনির্ধারিতভাবে নফল ইবাদত করা।

৪-পরদিন রোযা রাখা এটি মুস্তাহাব ।

( বাহরুর রায়িক ২/৫২)

(فضائل وأحكام شب برات ص٨)(الفتوى الهندية ٥/٣٥٠)

● এ রাতে বর্জনীয় কিছু বিষয় :

১ হালুয়া রুটির মত আনন্দ উল্লাসের আয়োজন। আল্লাহর কাছ থেকে মাফ পেতে হলে তার ইবাদত করতে হবে, খাওয়া দাওয়ার মধ্য দিয়ে ফুর্তি করার মাধ্যমে নয়।

২ আতশবাজি করা, রং ছিটানো এগুলোও বর্জনীয়।

৩ সম্মিলিত কোন আমলকে এই রাতে আবশ্যকীয় মনে করা সুষ্পষ্ট বিদআত।

( দেখুন বাহরুর রায়িক ৫/২১৫)

বি:দ্র: বিভিন্ন হাদীসের আলোকে এসেছে এ রাতে কিছু লোককে আল্লাহ পাক ক্ষমা করবেন না । ওদের মধ্যে অন্যতম হল মুশরিক ও হিংসুক,আত্মীয়তা ছিন্নকারী, মাতা পিতার অবাধ্য সন্তান,মদ্যপানকারী এবং ব্যভিচারকারী নারী পুরুষ ইত্যাদি ।

সুতারাং শবে বরাতের পূর্বেই সকল মুসলমান নবী প্রেমিক ব্যক্তিদের জন্য আবশ্যক কাজ হবে,উপরোক্ত অপরাধ সমুহের সাথে কেউ জড়িত থাকলে খালেছ মনে একাগ্রতার সহিত আল্লাহর দরবারে তওবা করে নেওয়া । এবং অপরাধ ক্ষমা করানো ।

অন্যথায় শবে বরাতেও এসব সম্প্রদায়ের অপরাধ ক্ষমা করানোর পথ উন্মুক্ত থাকবেনা । তাই তাওবা করে এসব পাপ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে হবে । আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন।আল্লাহ পাক আমাদের ক্ষমা করুন । আমীন ।

দোয়া: হে আল্লাহ! তুমি আমাদের সত্যকে সত্য হিশেবে উপস্থাপন করে দাও,যেন তা পালন করতে পারি,আর মিথ্যাকে মিথ্যা হিসেবে উপস্থাপিত করে দাও,যেন এ থেকে বিরত থাকতে পারি।