শায়খ আতাউর রহমান সিলেটি: একজন নিভৃতচারী হাদীসবিজ্ঞানী

জীবন দর্শন

আবদুল্লাহ মায়মূন: ইলমু হাদীসের বাংলা অর্থ যদি হয় হাদীসশাস্ত্র, তাহলে ‘উলুমুল হাদীস’র বাংলা অর্থ কী হবে? আমার মনে হয় উলুমুল হাদীসের বাংলা অর্থ হাদীস বিজ্ঞান হতে পারে। হাদীসবিজ্ঞান ছাড়া অন্য কোনো শব্দ এর পরিপূর্ণ অর্থ আদায় করে না।

ছাত্রজীবনে হাদীসবিজ্ঞানের প্রাথমিক মৌলিক পুস্তক নুখবাতুল ফিকার পড়লেও হাদীসবিজ্ঞানের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক হয় ২০১৭সালে।

তখন আমি ঢাকায় একটি মাদরাসার শিক্ষক, ওই মাদরাসায় সদ্য মাত্র উলুমুল হাদীস বিভাগ খোলা হয়। আমাকে উলুমুল হাদীসের কিতাব ইমাম নববী রাহ: রচিত ‘ইরশাদু তুল্লাবিল হাকায়িক’ পড়ানোর জন্যে দেওয়া হয়। এই কিতাবটি পড়া তো দূরের কথা, এর আগে এই কিতাবের নামই শুনি নি। তো কিতাবটি কীভাবে পড়াবো? এ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই। সাথে সাথে স্মরণ হলো আমার প্রিয় শায়খ, উস্তাদে মুহতারাম মুফতি আতাউর রাহমান সিলেটি হাফিজাহুল্লাহের কথা। তাঁর কাছে ফোন দিলাম, তিনি আমাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে গভীর অধ্যয়নের প্রতি উৎসাহিত করেন। ঢাকা থেকে সিলেট ফেরার পথে হুজুরের জন্যে আরববিশ্বের মেধাবী মুহাক্কিক নুরুদ্দীন ইথর রাহ: কর্তৃক লিখিত ইরশাদের তাহকীক নিয়ে আসি। হুজুরকে এক কপি হাদিয়া দেই। হুজুর কিতাবটি হাতে নিয়ে খুব অল্প সময়ে কিতাবটির রিভিউ মৌখিকভাবে বলেন৷ কিতাবটির বিভিন্ন তাহকীকের উপরও আলতো মন্তব্য করেন। হুজুরের তাৎক্ষণিক মূল্যায়নে আমি রীতিমত অবাক হয়ে যাই। দীর্ঘদিন ধরে হুজুরকে অতি নিকট থেকে দেখছি, কিন্তু হাদীসবিজ্ঞানে যে হুজুর এত বড় অভিজ্ঞ অশ্বারোহী তাতো জানি না। মনে হল, আজ আমি এক নতুন শেকড়সন্ধানী হাদীসবিজ্ঞানীকে আবিষ্কার করলাম।

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী দরগাহ মাদরাসার প্রবীণতম উস্তাদ হচ্ছেন আমাদের প্রিয় শায়খ আতাউর রাহমান সিলেটি হাফিযাহুল্লাহ। ৩৭বছর ধরে ওই মাদরাসার উস্তাদ হয়ে ইলমে নববীর খেদমত আঞ্জাম দিচ্ছেন। হুজুরের সাথে আমাদের সম্পর্ক অনেক পুরনো, আমার পিতা শায়খুল হাদীস মাহমুদ হোসাইন দাঃবাঃ’র অত্যন্ত জিগরি দোস্ত হচ্ছেন আমাদের এই উস্তাদ। বাল্যকাল থেকেই উনারা পরস্পরে দোস্ত। আজপর্যন্ত তা অব্যাহত আছে। আমার আব্বার অনেক দোস্ত-আহবাব আছেন। কিন্তু অত্যন্ত প্রিয় ও সম্মানী দোস্ত হচ্ছেন এই হুজুর। আব্বা নিজে উনাকে একজন গুমনাম(অপরিচিত) ওলী হিসেবে গণ্য করেন। আমি নিজে আব্বাকে দেখেছি খাবারে বসে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে হুজুরের ভাতের পাতে তরকারী বেড়ে দিতে। মনে হচ্ছে তিনি কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ বুজুর্গের খেদমত করছেন। অথচ বয়েস ও শ্রেণী বিন্যাসের দিক দিয়ে হুজুরের চেয়ে আব্বা বড়। আসলে গুণীজনের মূল্যায়ন গুণীজনই দিতে পারে।

দরগাহ মাদরাসায় পড়াকালে হুজুরের সাথে ছিল আমাদের তালীমী ও তারবিয়াতী সম্পর্ক। এখনপর্যন্তও তা অব্যাহত আছে আলহামদুলিল্লাহ। হুজুর আমাদের (আমাকে ও আমার অনুজ হাফিজ মাওলানা আব্দুল্লাহ ফাহিম) কে খুব স্নেহ করেন। আব্বার সাথে বন্ধুত্বের সুত্রধরে আমাদেরকে হুজুর ভাতিজা বলে সম্বোধন করতেন। যেহেতু হুজুরকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে কাছ থেকে দেখতেছি, এজন্যে হুজুরকে আমরা অন্যদের তুলনায় একটু হলেও বেশি জানি।

আমাদের একটি অভ্যাস হলো, যে, আমরা বেশি পরিচিত ব্যক্তিকে বেশি জ্ঞানী মনে করি, তার সাথে সাক্ষাৎ করতে, তার সাথে সময় কাটাতে, তাকে নিয়ে লিখতে পছন্দ করি। আর অপরিচিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে আমাদের আচরণ হয় ঠিক এর উলটো।

আমাদের এই হুজুর হচ্ছেন এমন এক অপরিচিত নিভৃতচারী অথৈ সমুদ্রের মুক্তো, যার বিকিরণ খুবই কম অবলোকন করেছে।

ইলম নববীর প্রকান্ড মহীরুহ, আখলাকে নববীর মুখলেস অনুসারী, মেজাযে শরীয়তের দীপ্ত ধারণকারী, আওসাফে আকাবিরের প্রদীপ্ত ধ্রুবতারা হচ্ছেন আমাদের এই হুজুর।

ইলমে হাদীসে আছে হুজুরের অনন্য শক্তিশালী বিচরণ। ইলমে হাদীসের গভীর জ্ঞান তিনি গ্রহণ করেন, শায়খুল ইসলাম তাকী উসমানী হাফিযাহুল্লাহের হাত ধরে। উনার কাছ থেকেই তিনি ইলমে হাদীসের শিক্ষা হাতে কলমে শিখে নেন। শায়খুল ইসলাম তাকী উসমানী দা.বা. যখন উনার অনবদ্য গ্রন্থ, শায়খুল ইসলাম শিব্বীর আহমদ উসমানি রাহ. রচিত সহীহ মুসলিমের অনন্য অপূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘ফাতহুল মুলহিমে’র পরিপূর্ণ ‘তাকমিলা’ রচনা শুরু করেন, তখন রচনাকালে আমাদের এই হুজুর শায়খুল ইসলামকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অধ্যায়ে তাহকীকী সহযোগিতার খেদমত আঞ্জাম দেন। এছাড়াও ইলমে হাদীসে হুজুরের শায়খ ছিলেন বিংশ শতাব্দীতে পুরোবিশ্বে হাদীসবিজ্ঞানের উজ্জ্বল নক্ষত্র শায়খ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ:, এবং শেকড়সন্ধানী হাদীসতাত্ত্বিক শায়খ আব্দুর রশীদ নুমানী রাহ:। ইলমে হাদীসে পান্ডিত্য অর্জনের জন্যে এই কয়েকজন নক্ষত্রের সামান্য সান্নিধ্যই যথেষ্ট, কিন্তু আমাদের শায়খ এঁদের সান্নিধ্যে কয়েকটি বছর ব্যয় করে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে জ্ঞান আহরণ করেন। এখনপর্যন্ত শায়খুল ইসলাম তাকী উসমানি দা:বা:’র হুজুরের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। আমরা নিজেরা দেখেছি, যখন শায়খুল ইসলাম সাহেব বাংলাদেশে আসেন, তখন তিনি তাঁর নির্বাচিত প্রথম শ্রেণীর কয়েকজন ছাত্রদের জন্যে হাদিয়া নিয়ে আসেন। তখন আমাদের এই হুজুর শায়খুল ইসলামের নির্বাচিত প্রথম তালিকায় থাকতেন। শায়খুল ইসলাম তাঁকে রূমাল-পেস্তা হাদিয়া দিতেন।শায়খ আব্দুর রশীদ নুমানি রাহ: হুজুরের কাছে এই বলে সংবাদ পাঠিয়েছেন, যে, তিনি যেনো হানাফি মাযহাবের উপর স্বতন্ত্র দলীলভিত্তিক একটি হাদীসের পুস্তক লিখেন। এখানে চিন্তা করার বিষয় হলো, যে, ‘এক ছাত্রের ইলমের উপর কতটুকু আস্থা থাকলে তাঁর শায়খই তাঁকে কিতাব রচনার প্রস্তাব দেন!’

যারা সিলেটের দরগাহ মাদরাসায় পড়েছেন, তারা অতি নিকট থেকেই হুজুরকে দেখেছেন, তারা ভালোভাবেই জানেন কীভাবে হুজুর ইলমে নববী, আমালে নববী, আখলাকে নববীর তরে নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছেন। যশ-খ্যাতি দুনিয়ামোহ ত্যাগ করে চলনে-বলনে, আহারে-পরনে কীভাবে হুজুর তাকওয়া অবলম্বন করেন, তা সবার নজরে অবশ্যই পড়েছে। সাদাসিধে অথচ অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন, আত্মমর্যাদাশীল অথচ অল্পে তুষ্ট তথা ইলম-আমল-তাকওয়ার অপূর্ব সমন্বয় হচ্ছেন আমাদের এই নির্মোহ নিভৃতচারী শায়খ।

হাদীসে এসেছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা মুমিনদের ফিরাসত(দূরদর্শিতা) থেকে বেঁচে থাকো, কেননা সে আল্লাহর নুরের আলোকেই অবলোকন করে।’ এরই ধারাবাহিকতায় আমরা জানি, ইমাম আজম আবু হানিফা রাহ: সহ অতীতের অনেক আকাবিরের কারামত ছিল, যে, তারা মানুষের গোনাহ দেখতে পেতেন।

আপনি বিশ্বাস করুন বা নাই করুন, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, যে, ‘আমাদের এই শায়খ হচ্ছেন এমন এক শিরোনামহীন বুজুর্গ যিনি অনেক মানুষের গোনাহ দেখতে পান’। এ কথাটি আমার কাছে একাধিক বিশ্বস্তসুত্রে প্রমাণিত৷ এজন্য এই বাস্তবতা কেউ অস্বীকার বা আপত্তি করলে অসুবিধা নেই৷ কেননা এটা বিশ্বাস করা জরুরী নয়, এবং ঈমানের সাথে সম্পর্কিত কোনো বিষয় নয়।

শায়খের জীবনের সবচেয়ে বড় কীর্তি হচ্ছে, ফিকহী তারতীবে হানাফী মাযহাবের সবচেয়ে সমৃদ্ধ হাদীসগ্রন্থ ‘এলাউস সুনান’ তালখীস-করণ। হাকীমুল উম্মাহ আশরাফ আলী থানবী রাহ:’র নির্দেশে তাঁরই হাতেগড়া শিষ্য, আপন ভগ্নিপুত্র আল্লামা যফর আহমদ উসমানি রাহ: আঠার বছর ব্যয় করে, ২১খন্ডে এই গ্রন্থটি সংকলন করেন। গ্রন্থটির কলেবর বড় হওয়ায় সবাই সমানভাবে তা থেকে উপকৃত হতে পারে না। এজন্য প্রয়োজন ছিল গ্রন্থটির সংক্ষিপ্ত তালখীস করার। এই কাজ করতে এগিয়ে আসেন নিভৃতচারী নির্মোহ হাদীসবিজ্ঞানী মুফতি আতাউর রহমান সিলেটি দা:বা:। ১৪০৬ হিজরিতে পাকিস্তানে পড়ালেখা শেষ করে সিলেটের দরগাহ মাদরাসায় উস্তাদ হিসেবে নিয়োগ পান। তখন থেকে হুজুর নিজেকে ‘এলাউস সুনানে’র সংক্ষিপ্তকরণের মহান কাজে আত্মনিয়োগ করেন। হাড়কাঁপানো শীতের প্রকোপ, কালবোশেখীর তাণ্ডব, গ্রীষ্মের লু হাওয়া, বসন্তের মন মাতানো সমীরণ, বর্ষার প্রবল ঝড় ব্যাহত করতে পারে নি শায়খের চলার গতি, এমনকি মন্থরও করতে পারে নি প্রদীপ্ত প্রত্যয়কে। এভাবে ধারাবাহিক ৩৭ বছরের নিরলস পরিশ্রমে সমাপ্ত হয়েছে তালখীসের অনবদ্য কাজ। ২১ খন্ডের এই গ্রন্থকে তিনি ৪খন্ডে সীমিত করেছেন। ইলমে হাদীসের এক বিশাল সমুদ্রকে সুপেয় মিষ্ট কূপে রূপান্তর করেছেন। একাই এক একাডেমির কাজ সম্পন্ন করেন। ইতোমধ্যে ১ম ২খন্ড প্রকাশিত হয়েছে, শেষ দু-খন্ড খুব দ্রুত প্রকাশ পাবে ইনশাআল্লাহ। কম্পোজ সমাপ্ত শুধু প্রুফ দেখার বাকী আছে।

বাংলাদেশে হাদীস বিজ্ঞানের অনেক কাজ হলেও রচনার ক্ষেত্রে আমার জানামতে এ মাটিতে আর কেউ এত বড় কাজ করতে পারে নি। ধারাবাহিক ৩৭বছর নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠাংশ, যৌবনের তপ্ত দিনগুলোকে বিলিয়ে দিয়েছেন হাদীসের একটি গ্রন্থের সংক্ষিপ্তকরণে। ডায়বেটিস ও হাইপ্রেশারের মত দীর্ঘস্থায়ী রোগ নিয়ে, শারীরিকভাবে দুর্বলতাকে সঙ্গী করে নিপুণ শৈল্পিক ছন্দে চলছেন অবিরাম আপন গন্তব্যপানে। পর্বতসম অটলতা, পাথুরে শৃঙ্গসম অবিচলতার চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন আব্দুল্লাহ বিন মাসউদের এই নীরব অনুসারী। ইস্তেকামাহ ফাওক্বাল কারামাহ(অবিচলতা কারামতের চেয়েও উর্ধ্বে)র জীবন্ত অনুমপ উদাহরণ হচ্ছেন আমাদের এই শায়খ। তালখীস ছাড়াও শায়খের পনেরটির উপর গবেষণালদ্ধ গ্রন্থ রয়েছে। আল্লাহ চাইলে সবই প্রকাশিত হবে ইনশাআল্লাহ।

আসলে আমাদের ‘আমরা’ হওয়ার অন্তরালে অদৃশ্য কিছু কারিগরের দক্ষ হাতের নিপুণ কারুকার্য রয়েছে, শায়খ আতাউর রহমান সিলেটি দা:বা: হচ্ছেন এরকমই একজন দক্ষ কারিগর। যার হাত ধরে অনেক পুষ্প কাননে রূপ নিয়েছে, মাটি সোনায় পরিণত হয়েছে, একটি বীজ রূপ নিয়েছে ফলবান ছায়াদার বৃক্ষে।

আলহামদুলিল্লাহ! ইতোমধ্যে শায়খের কর্মের মূল্যায়ন দেওয়া শুরু হয়েছে, বাংলাদেশের আলেমদের নিয়ে লিখিত শায়খ হিফজুর রহমান দা.বা.’র অনবদ্য গ্রন্থে স্থান পেয়েছে শায়খের পরিচিতি। তাছাড়া অন্যান্য গ্রন্থ প্রকাশের জন্যেও দেশে-বিদেশে অবস্থিত শায়খের ছাত্র ও শিষ্যরাও এগিয়ে আসছেন। আমরা প্রত্যাশা করি তাঁর জীবদ্দশায়ই যেনো তাঁর কীর্তি-কর্মের মূল্যায়ন করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *