সিলেটের ফুলতলী কামিল মাদরাসার শতবর্ষ উদযাপন আগামীকাল

শিক্ষাঙ্গন সংবাদ

দিন-মাস-বছর-যুগ-অর্ধ শতাব্দির সীমানা গড়িয়ে শতবর্ষে পদার্পণ করছে বাংলাদেশের উত্তর পূর্ব সীমান্তে, সুরমা-কুশিয়ারার বাহুডোরে আবদ্ধ জকিগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি প্রতিষ্ঠান ‘বাদেদেওরাইল ফুলতলী কামিল (এম.এ) মাদরাসা’। দ্বীনি এ প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল হযরত শাহজালাল (র.) বুযুর্গ হযরত আলা বখশ (র.) ধারাবাহিক উত্তরসূরী হযরত মাওলানা ফাতির আলী (র.) উদ্যোগে। শ্যামল সবুজ নিভৃত পল্লীতে ইসলামী শিক্ষার প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে ১৯২০ সালে প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল এই দ্বীনি মশাল।

এ প্রতিষ্ঠানের শতবর্ষ উদযাপন নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা বইছে সাবেক ও বর্তমান ছাত্রসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। তারা ইতিহাসের পাতায় মাদরাসার রূপ-রস রাঙিয়ে রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন অফুরন্ত। এ মাদরাসায় শিক্ষা জীবন পার করে দেশ ও দেশের বাইরে দ্বীনি খেদমতে নিয়োজিত রয়েছেন অসংখ্যজন। তাদের মিলনমেলায় বাড়তি আকর্ষণ ছড়াবে শতবর্ষী অনুষ্ঠানটি। এদিকে, সমৃদ্ধ একটি স্মারক প্রকাশনা সম্পন্ন করা হয়েছে। স্মারকে বানী প্রদান করেছেন প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, একাধিক মন্ত্রীসহ দেশের গণ্যমান্য শিক্ষাবিদ ও শিক্ষানুরাগীরা।

অনুষ্ঠানের অতিথি তালিকায় রয়েছেন- পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, বন ও পরিবেশমন্ত্রী সাহাব উদ্দিন, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি, সিলেট বিভাগের একাধিক এমপিসহ বিশিষ্টজন। এছড়া উপস্থিত থাকবেন মিশরের ইসলামিক ব্যক্তিত্ব ড. মোহাম্মদ ইয়াহইয়া আল কিত্তানী আল আজহার, ভারতের উজানডীহির পীর সাহেব সৈয়দ মুস্তাক আল মাদানী ও জুনায়েদ আল মাদানী।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শুরুতে মসজিদ কেন্দ্রিক শিক্ষাদান কর্মসূচির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন হযরত মাওলানা ফাতির আলী (র.)। পরবর্তীতে মসজিদ থেকে আলাদা করে বর্তমান স্থানে মাদরাসার গৃহ নির্মাণ করা হয় এলাকাবাসীর সহযোগিতায়। এক পর্যায়ে মাদরাসা ক্যাম্পাস বর্ধিত করণে জমি দানের হাত প্রসারিত করেন যুগ শ্রেষ্ঠ আলেমেদ্বীন হযরত আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী ছাহেব (র.)। শুধু দানের মধ্যেই তার অবদান শেষ নয়, মাদরাসার ইতিহাসে অন্যতম এক আলোকিত অলংকার তিনি। কারণ এই মাদরাসার কৃতি ছাত্র, আদর্শ শিক্ষক, অনুকরণীয় অভিভাবকও তিনি।

দেশ বিভাগের পর ১৯৫০ সালে হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব বদরপুর (আসাম) থেকে গ্রামের বাড়ি ফুলতলীতে ফিরে আসেন। পুনরায় তার উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতায় মাদরাসা নতুন করে যাত্রা শুরু করে। মাদরাসার সভাপতি বা মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। ’৫৯ সালে মাদরাসাটি দাখিল স্তরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক স্বীকৃতি পায়। ’৭৫ সালে প্রলয়ংকরী কাল বৈশাখী ঝড়ে মাদরাসা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। মাদরাসাটি পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আবারো হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব (র.) দানের হাত প্রসারিত করেন। মাদরাসার পূর্ব ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে তার সুযোগ্য উত্তরসূরী ছাহেবজাদা মাওলানা মো. নজমুদ্দীন চৌধুরীকে মাদরাসার দায়িত্বে নিযুক্ত করা হয়। তার একনিষ্ট প্রচেষ্ঠায় ’৭৭ সালে মাদরাসাটি আলিম স্তরে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের স্বীকৃতি লাভ করে।

১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন ধর্ম, ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট ও বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের সভাপতি মরহুম আলহাজ মাওলানা এম.এ মান্নান ফুলতলীতে এক সমাবেশে যোগদান করেন। এখানে অবস্থানকালে মাদরাসা পরিদর্শন করে ভ‚য়সী প্রশংসা করেন এবং মাদরাসাটি কামিল পর্যন্ত উন্নীত করার জন্য আল্লামা ফুলতলী ছাহেবকে সুপরামর্শ দেন। পরবর্তীতে তার সহযোগিতায় মাদরাসাটি ’৮৯ সালে ফাজিল, ’৯৪ সালে কামিল (হাদীস) ও ২০০১ সালে কামিল (তাফসীর) স্তরে স্বীকৃতি লাভ করে।

আরবী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে ২০০৬ সালে আল্লামা ফুলতলী ছাহেব (র.) সিলেট থেকে ঢাকা অভিমুখে লংমার্চ কর্মসূচি পালন করেন। বৃহত্তর আন্দোলনের মুখে তৎকালীন সরকার সে বছরই মাদরাসার ফাযিল ও কামিল স্তরকে যথাক্রমে বি.এ ও এম.এ সমমানে উন্নীত করে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার অধীনে ন্যস্ত করে। ২০১০ সালে ফুলতলী মাদরাসায় ফাযিল শ্রেণিতে ৪টি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু হয়। ২০১৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ‘ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় বিল’ পাশ হয়।

বর্তমানে বাদেদেওরাইল ফুলতলী কামিল এম.এ মাদরাসা ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ইসলামী শিক্ষাধারার সর্বোচ্চ স্তরের একটি মাদরাসা। এ প্রতিষ্ঠানে দাখিল থেকে কামিল স্তরের পাশাপাশি আল হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে ফাযিল বি.এ (অনার্স) ও কামিল (মাস্টার্স) কোর্স চালু রয়েছে। বাদেদেওরাইল ফুলতলী কামিল (এম.এ) মাদরাসা ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইতোমধ্যে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছে দেশব্যাপী। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করছে।

জেআর/