স্মৃতির পাতায় ক্বারী মুহাম্মদ শামীম আহমদ রহ.

জীবন দর্শন

মুহাম্মদ যুবায়ের আহমদ: তিনি ১৯৯৯ খৃস্টাব্দের ১০ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ জেলার, ছাতক থানাধীন, কালারুকা ইউনিয়নের নয়া লম্বাহাটি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পরিবারের বড় এবং একমাত্র পুত্র সন্তানের আগমনে যারপরনাই খুশি হোন পিতা হাজী মুহাম্মদ আইছ আলী সহ সকল আত্মীয়-স্বজন।

তাঁর প্রাথমিক পড়াশোনা গ্রামের স্কুলে। এবং সমাপনী পরীক্ষার মাধ্যমে স্কুল লাইফের ইতি টানেন। তারপর দ্বীনী পড়াশোনার প্রতি মনোনিবেশ করেন। প্রথমে জামেয়া হাসনাবাদ মাদরাসায় ইবতেদায়্যািহ ও মুতাওয়াসসিতাহ জামাতগুলো শেষ করেন। এরপর চলে যান জামেয়া সাদারাই মাদরাসায়। সেখানে আলিয়া প্রথম বর্ষ থেকে তৃতীয় বর্ষ পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। অত:পর উচ্চ-শিক্ষা লাভের জন্য পাড়ি জমান, ঐতিহ্যবাহী দ্বীনী বিদ্যাপীঠ, দেশের সুপ্রসিদ্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘জামিয়া ক্বাসিমুল উলূম দরগাহে হযরত শাহজালাল রহ. সিলেটে’।

জামিয়া ক্বাসিমুল উলূমে তিনি আলিয়া ৪র্থ বর্ষ থেকে তাকমীল ফিল হাদীস (মাস্টার্স) পর্যন্ত পৌঁছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় তাকমীল ফিল হাদীস সমাপ্ত করার পূর্বেই তাঁর জীবনের সমাপ্তি ঘটে।

উস্তাদ, সহপাঠী, আত্মীয়-স্বজন, এবং পাড়া-পড়শীর ভাষ্যমতে ‘ক্বারী মুহাম্মদ শামীম রহ.’ ছিলেন অতি নম্র, ভদ্র, ও বিনয়ী একজন মানুষ। তাঁর আমল- আখলাক, আচার-ব্যবহার, চালচলন ছিলো রাসূল সা. এর আদর্শ মোতাবেক।

সহপাঠীদের মাঝে তিনি ছিলেন সহনশীল, ধৈর্যশীল, বিনম্র ও ভালোবাসার অনুপম ব্যক্তিত্ব।

উস্তাদগণের আনুগত্যে ছিলেন অনন্য। নিজ উস্তাদগণকে পৃথিবীর শ্রেষ্ট উস্তাদ মনে করতেন। নৈতিক অধপতনের এযুগে এমন তালিবুল ইলিম সত্যিই বিরলও বটে।

তিনি যেমন উস্তাদগণকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতেন তেমনি তাঁর উস্তাদগণও তাঁকে স্নেহের দৃষ্টিতে দেখতেন। আমরা তাঁর জানাযার নামাজে উস্তাদগণকে উচ্চস্বরে কাঁদতে দেখেছি! তাঁদের পবিত্র যবানে প্রশংসা শুনেছি। উস্তাদগণের এমন অশ্রুভেজা মুনাজাত ক’জনেরই বা ভাগ্যে জুটে?

ক্বারী শামীম আহমদ রহ.’র অনেকগুলো গুণের মধ্যে একটি হচ্ছে; তিনি মুআ’মেলার ব্যাপারেও ছিলেন স্বচ্ছ। কখনো দু’টো টাকাও মা-বাবার অজান্তে ঋণ করেননি! কিন্তু আমরা? আহ!

বিগত এক রামাদানে আমার কাছ থেকে বিকাশে তিনশত টাকা নিয়ে দান করেছিলেন চট্টগ্রামের এক উস্তাদের মাদরাসায়। তখন তিনি ছিলেন সুনামগঞ্জ খেদমাতে। আর আমি মৌলভীবাজারে। ২৭ শে রামাদান যখন দু’জন বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। ঘটনাক্রমে তিনি আমার পরে বাড়িতে ফিরেন। বাড়িতে আসার পর সম্ভবত ঘরে উঠার আগেই আমার ঋণ পরিশোধ করে তবেই প্রশান্তির শ্বাস ফেলেন।

মরহুম শামীম রহ.’র গুণাবলীর কথা লিখে শেষ করা যাবে না! আর দীর্ঘ লেখার অবকাশও নেই।

তিনি তালিবুল ইলিম অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। আবার দুর্ঘটনায়! আর রাসূল সা. উভয় অবস্থারই সুসংবাদ দিয়েছেন। শাহাদাতের সুসংবাদ-হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম সা. ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি প্রত্যাবর্তন করার আগ পর্যন্ত ইলিম অন্বেষণে বের হল, সে শাহাদাতের মর্যাদা অর্জন করল। তিরমিজি, দারিমি। আমরা দু’আ করি আল্লাহ যেন তাঁকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করেন, আমীন!

ক্বারী শামীম আহমদ রহ. বিগত ৪ আগস্ট (২০২০) মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১০ ঘটিকার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ইহজগৎ ত্যাগ করে মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান! ইন্না লিল্লাহি ….

পরেরদিন বুধবার সকাল ১১ ঘটিকায় ‘জামেয়া ইসলামিয়া মদীনাতুল উলূম দারুল হাদিস নয়া লম্বাহাটি মহিলা মাদরাসা’র মাঠে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযায় উপস্থিত উস্তাদবৃন্দ, সহপাঠী, বন্ধু-বান্ধব, একালার ছোট-বড় সবাই নীরবে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদেন এবং অশ্রুসিক্ত নয়নে শেষ বিদায় জানান। আল্লাহ তাঁর পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, মা-বাবা সবাইকে ধৈর্যধারণ করার মত অসীম শক্তি দান করুন! বিশেষ করে তাঁর মমতাময়ী মা-কে আল্লাহ সান্ত্বনা দান করুন। এবং উত্তম প্রতিদান দিন। আমীন!

শিক্ষার্থী, জামেয়া দরগাহ সিলেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *